পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় কার্যকর হওয়া ১৫ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ২২ এপ্রিল রাতে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য পাকিস্তানে কোনো প্রতিনিধিদল পাঠায়নি ইরান।
এমনকি যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর জন্য ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো অনুরোধও জানানো হয়নি। কিন্তু তারপরও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ একতরফাভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। শুধু ইরানের সঙ্গেই নয়, লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মেয়াদও তিন সপ্তাহ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোর ট্রাম্পের এই ঘোষণা পাকিস্তানের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার চেয়েও বেশি কিছু নির্দেশ করে। এই ঘোষণা কার্যত ওয়াশিংটনের সশস্ত্র বাহিনী বা সামরিক পদ্ধতির সীমাবদ্ধতাকেই প্রকট করে তুলেছে। ইরানের মতো একটি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে উত্তেজনা দীর্ঘায়িত রাখার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক ক্ষমতার অধিকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রকেও যে জটিলতার মুখে পড়তে হয়, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর এই একতরফা পদক্ষেপ তারই ইঙ্গিত বহন করে। বর্তমানে ইরান এমন এক প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যারা ট্রাম্পের ভীতি প্রদর্শনের কাছে নতি স্বীকার করতে মোটেই প্রস্তুত নয়।
ইরানের সঙ্গে প্রথম দফার ১৫ দিনের যুদ্ধবিরতির সময় পার হওয়ার একেবারে শেষ মুহূর্তে একতরফাভাবে মেয়াদ অনির্দিষ্টকাল বাড়িয়ে হোয়াইট হাউস ইঙ্গিত দিচ্ছে, তারা ইরানের ওপর সংঘাতের শর্ত একতরফাভাবে চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছে। এর সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা হলো এটাই যে, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর এই ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পশ্চাদপসরণ ছাড়া আর কিছু নয়। যুদ্ধ পরিস্থিতি পরীক্ষা করার পর যুক্তরাষ্ট্র এমন এক বাস্তব সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হয়েছে, যেখানে তারা ইরানের বিরুদ্ধে কৌশলগত সুবিধা অর্জন করতে পুরোপুরি ব্যর্থ। ইরানের পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা, তার অবকাঠামোর স্থিতিস্থাপকতা এবং ইরান-সমর্থিত আঞ্চলিক প্রতিরোধ অক্ষের মধ্যে সমন্বয় করাসহ সবকিছু মিলেই ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয়কে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ একতরফাভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্যে পরাজয় স্বীকার না করে পিছু হটার একটি চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটা সুস্পষ্ট সামরিক বিপর্যয়ের মুখে রাজনৈতিক প্রতিরোধের একটি চিরাচরিত কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়। তবে, এর আরেকটি ব্যাখ্যা আছে, যা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। সেটা হচ্ছে, মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাস থেকে দেখা যায়, ওয়াশিংটনের যুদ্ধবিরতি অনেক সময়ই তাদের অবস্থান পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির এই ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের দিক থেকে নেওয়া পরোক্ষ পদক্ষেপ, গোপন অভিযান বা বাছাইকৃত হামলার একটি আবরণ হিসেবে কাজ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের প্রবণতা সম্পর্কে অবগত থাকায় ইরান এরই মধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা এ ধরনের পরিস্থিতিকে একটুও হালকাভাবে নিচ্ছে না এবং তাদের কৌশলগত প্রস্তুতি তারা বজায় রাখছে। অন্য কথায়, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির ট্রাম্পের একতরফা ঘোষণা শান্তির ইঙ্গিত দেওয়ার পরিবর্তে শুধু নতুন কোনো অভিযান চালানোর জন্য বিরতি হিসেবে কাজ করতে পারে।
আর এই প্রেক্ষাপটে ইহুদি বর্ণবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল কেন্দ্রীয় ভূমিকায় চলে আসার সম্ভাবনা বেশি এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার সরাসরি সম্পৃক্ততা কমিয়ে আনার পরিকল্পনা করতে পারে। একই সঙ্গে লেবাননে হিজবুল্লাহর যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অজুহাতে ইসরাইলকে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সবুজসংকেতও দিতে পারে ট্রাম্প প্রশাসন। এই পদক্ষেপ বা পরিকল্পনা সংঘাতকে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার একটি সুপরিচিত মার্কিন কৌশলেরই অংশ, যেখানে সম্পূর্ণ যুদ্ধের ব্যয়ভার নিজেরা বহন না করেই প্রতিপক্ষের ওপর চাপ বজায় রাখা হয়। তবে, ইরান এরই মধ্যে স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ থেকে সরে যাওয়ার ভান বা কোনো ধরনের কৃত্রিম বিচ্ছিন্নতা তৈরির যেকোনো পরিকল্পনা সম্পর্কে সতর্ক রয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে আরো বলা হয়েছে, তারা নতুন করে যেকোনো আগ্রাসনকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ দায়িত্ব হিসেবেই গণ্য করবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করা থেকে ইরানকে সরানোর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যেকোনো ধরনের সামরিক তৎপরতা প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে তেহরান।
ইরানের সমুদ্র বন্দরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত থাকা মানেই সংঘাতের ধারাবাহিকতাও অব্যাহত থাকা। কিন্তু ইরানের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে অচল করে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে স্থায়ী উত্তেজনা বজায় রাখারÑঅর্থাৎ ‘যুদ্ধের ছায়া’ বজায় রাখার মার্কিন প্রচেষ্টাও সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের হাতে যে বড় অস্ত্রটি রয়েছে, তা হচ্ছে হরমুজ প্রণালি। এই নৌপথটি ব্যবহার করে বৈশ্বিক জ্বালানি প্রবাহকে সরাসরি প্রভাবিত করার ক্ষমতা ইরানের রয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, তাদের অবরোধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরানের বন্দরে আর কোনো জাহাজ যাতায়াত করতে পারছে না। ফলে হরমুজে ইরানের কর্তৃত্ব হ্রাস পাচ্ছে।
কিন্তু ইরান জানিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ প্রত্যাহার করা না হলে তারা হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেবে না এবং প্রয়োজনে সম্পূর্ণ অবরোধ আরোপ করতে পারে। এটি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ইরানের চাপ প্রয়োগের এমন একটি কৌশল, যা বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে এবং সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুকে সামরিক ক্ষেত্রের বাইরে সরিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্র বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করলে তা শুধু ইরানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, বরং তা যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোসহ বৃহত্তর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যকেও হুমকির মুখে ফেলবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এটা অনুধাবন করতে না পারলে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা মিত্রদেরও তীব্র জ্বালানি সংকটের কবলে পড়াসহ অর্থনৈতিক গুরুতর সংকট মোকাবিলা করতে হবে।
সংগত কারণেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বৃদ্ধি করা সংঘাতের কোনো সমাধান নয়, বরং এটি সংঘাতকে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রতীকী অন্যান্য মাত্রায় স্থানান্তরিত করবে। একই সঙ্গে এটি এ কথাও প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্রের যুগ যুগ ধরে ব্যবহার করা একতরফাভাবে সংঘাত চাপিয়ে দেওয়ার অস্ত্রটি এখন আরো বেশি প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছে।
কারণ, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরান নিষ্ক্রিয় একটি পক্ষ হিসেবে নয়, বরং খেলার নিয়ম নতুন করে নির্ধারণকারী সক্রিয় একটি শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির ট্রাম্পের পদক্ষেপকে একটি ছাড় হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান এবং নিজেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রেখে শক্তির এমন এক নতুন ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেছে, যেখানে যুদ্ধের ব্যয়ভার আর সম্পূর্ণরূপে অন্যপক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র চাইলেও আর এটা করতে পারবে না।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ নেতারা বলছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দ্বিতীয় দফার আলোচনায় তারা যোগ দিলেও তাতে বড় কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। গত সপ্তাহে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী তেহরানের রাস্তায় সশস্ত্র কুচকাওয়াজের মাধ্যমে আবার তাদের শক্ত অবস্থানের জানান দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের একতরফা পদক্ষেপ এ কথাই প্রমাণ করে, যুদ্ধপরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেই। এটা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের ইচ্ছা অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতার ঘাটতিকেই প্রকাশ্যে আনছে। অনির্দিষ্টকালের এই যুদ্ধবিরতি কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতার একটি স্বীকৃতি, যা ট্রাম্প নিজেই প্রকাশ করেছেন। নতুন এই পরিস্থিতিতে এখন আর যুদ্ধ চলবে কি না, তা মূল প্রশ্ন নয়, বরং এই যুদ্ধ প্রকৃতপক্ষে কোন পক্ষের চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা এখনো আছেÑমূল প্রশ্নটি সেটাই।
মিডল ইস্ট মনিটর অবলম্বনে মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

