‘এটি ছিল সেরা সময়, এটি ছিল নিকৃষ্টতম সময়’—চার্লস ডিকেন্স যখন এই বাক্য দিয়ে এ টেল অব টু সিটিজ শুরু করেন, তখন তিনি শুধু সাহিত্যিক সৌন্দর্য তৈরি করছিলেন না; তিনি সময়কে বিশ্লেষণ করছিলেন। এই এক লাইনের ভেতরেই তিনি ধরেছিলেন এক যুগের দ্বৈতরূপ। একই সঙ্গে আশার আলো আর ধ্বংসের ছায়া। প্রগতির স্বপ্ন আর রক্তের বাস্তবতা। লন্ডন আর প্যারিস। দুটি শহর, কিন্তু তাদের গল্প আলাদা নয়। একটি শহর শান্ত। অন্যটি অস্থির। কিন্তু সেই অস্থিরতা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। সীমান্ত পেরিয়ে, সময় পেরিয়ে, সমাজের গভীরে।
ডিকেন্স দেখিয়েছিলেন, বিপ্লব হঠাৎ হয় না। এটি জমে ওঠে—ক্ষুধা, অপমান, বৈষম্য আর বঞ্চনার স্তরে স্তরে। প্যারিসে মানুষ শুধু রুটি চায় না, তারা চায় মর্যাদা। কিন্তু যখন সেই দাবির উত্তর আসে না, তখন ক্ষোভ সংগঠিত হয়, আর একসময় তা বিস্ফোরিত হয়। কিন্তু বিপ্লবের সেই বিস্ফোরণ মুক্তির পথ তৈরি করে না। তৈরি করে নতুন এক চক্র। গিলোটিন দাঁড়ায় ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে। পরে সেটিই হয়ে ওঠে অন্ধ প্রতিশোধের যন্ত্র। ডিকেন্স এখানে যে ভয়ংকর সত্যটি তুলে ধরেন তা হলো—সহিংসতা একবার শুরু হলে তা নিজেই নিজের কারণ
হয়ে ওঠে। ন্যায় প্রতিষ্ঠার নামে যে সহিংসতা শুরু হয়। তাই পরে অন্যায়ে রূপ নেয়।
আমরা ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইরানকে ঘিরে বর্তমান সংঘাতের দিকে তাকালে এই সাহিত্যিক সত্যটি নতুন করে আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রশ্নটি সরল নয়। এই দুই যুদ্ধ কি সত্যিই ‘এ টেল অব টু সিটিজ’-এর মতো তুলনার যোগ্য? সরাসরি নয়, তবে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে উত্তর দাঁড়ায়—হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে তা যায়। কারণ এখানে শহর নয়, বরং দুটি বাস্তবতা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে প্রতিরোধের গল্প, অন্যদিকে আগাম আঘাতের যুক্তি। একদিকে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন, অন্যদিকে নিরাপত্তার নামে শক্তি প্রয়োগের বাস্তবতা।
এই অস্বস্তিকর মিলটাই সামনে এনেছেন ওয়াশিংটন পোস্টের কলামিস্ট জেসন উইলিক। আইন, রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে লেখেন তিনি। তার বিশ্লেষণ—‘A dark analogy for the war in Iran’ মূলত একটি সতর্কবার্তা। তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধ শুধু ইরাক যুদ্ধের আলোকে দেখলে ভুল হবে; বরং রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের সঙ্গে তুলনা করলে একটি গভীর, অন্ধকার মিল চোখে পড়ে। তবে তিনি শুরুতেই পরিষ্কার করে দেন—এটি নৈতিক তুলনা নয়। ইউক্রেন আর ইরানের শাসনব্যবস্থা এক নয়, আমেরিকা আর রাশিয়ার রাজনৈতিক কাঠামোও এক নয়। কিন্তু যখন শক্তির রাজনীতি, নিরাপত্তার হিসাব আর যুদ্ধের কৌশল দিয়ে বিচার করা হয়, তখন মিলগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই মিলের প্রথম স্তরেই আছে ‘ভবিষ্যতের ভয়’। ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে রাশিয়ার যুক্তি ছিল, ইউক্রেন ভবিষ্যতে এমন অবস্থানে পৌঁছাতে পারে, যা রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য হুমকি হবে। ইরানের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে—আজ না হলেও ভবিষ্যতে তারা এমন অস্ত্র তৈরি করতে পারে, যা বড় শক্তির জন্য বিপজ্জনক হবে। অর্থাৎ যুদ্ধ শুরু হচ্ছে কোনো ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় নয়, বরং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ ঠেকানোর নামে। এ জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে বাস্তবতা নয়, সম্ভাবনা সিদ্ধান্তকে চালিত করছে।
ডিকেন্সের প্যারিসেও আমরা এই মানসিকতা দেখিÑযেখানে ভয় আর সন্দেহ বাস্তবতাকে ছাপিয়ে যায়। শাসকরা ভাবছিলেন তারা নিয়ন্ত্রণে আছেন, কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসই তাদের সবচেয়ে বড় ভুল হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক বিশ্বেও একই ভুলের পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত ভরসা বাস্তবতার জটিলতাকে আড়াল করে দেয়।
যুদ্ধের দ্বিতীয় স্তরটি আরো দৃশ্যমান—অসম লড়াই। ইউক্রেন যুদ্ধ আমাদের দেখিয়েছে, দুর্বল পক্ষ কীভাবে কৌশল বদলে শক্তিশালী পক্ষকে আটকে দিতে পারে। কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার বিশাল নৌবহরের সামনে ইউক্রেনের কার্যত কোনো শক্তিশালী নৌবাহিনী ছিল না। তবু তারা ড্রোন, নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র আর প্রযুক্তিনির্ভর আঘাতের মাধ্যমে সেই আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করেছে। বড় শক্তির জন্য পুরো নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হয়ে গেছে।
ইরানও একই কৌশল নিয়েছে, তবে ভিন্ন ভূগোলের মধ্যে। বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি। এই পথে ইরান কোনো শক্তিশালী নৌবাহিনী ছাড়াই এমন এক ঝুঁকির পরিবেশ তৈরি করেছে, যা বড় শক্তিকেও থামিয়ে দিচ্ছে। ড্রোন, মাইন, ছোট দ্রুতগতির নৌকা—এসব মিলিয়ে তারা দেখিয়েছে, নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও ভয় তৈরি করা যায়। উইলিকের বিশ্লেষণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ—একটি পানিপথ খোলা রাখা বড় শক্তির জন্য কঠিন কাজ; কিন্তু সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা ছোট শক্তির জন্য অনেক সহজ।
এই বাস্তবতা যুদ্ধের চরিত্র বদলে দিচ্ছে। আগে ভাবা হতো, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব মানেই দ্রুত জয়। এখন দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধ দীর্ঘ হয়, ব্যয় বাড়ে আর ফল অনিশ্চিত হয়ে ওঠে। ইউক্রেন যুদ্ধ এরই মধ্যে সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। ইরান সংঘাতও সেই একই পথে এগোচ্ছে—দ্রুত সাফল্যের বদলে দীর্ঘ ক্ষয়ের দিকে।
এই দীর্ঘায়িত যুদ্ধের তৃতীয় স্তর হলো—প্রক্সি বা ছায়াযুদ্ধ। ইউক্রেন যুদ্ধ খুব দ্রুতই রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের একটি ছায়াযুদ্ধে পরিণত হয়েছে। অস্ত্র, অর্থ, গোয়েন্দা তথ্য—সবকিছু দিয়ে পশ্চিমার এ যুদ্ধকে টিকিয়ে রেখেছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে। একইভাবে ইরান যুদ্ধও ধীরে ধীরে সেই পথে যাচ্ছে। রাশিয়া ইতোমধ্যে ইরানকে ড্রোন ও লক্ষ্য নির্ধারণের তথ্য দিচ্ছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে। ফলে এই সংঘাত আর দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি হয়ে উঠছে বৃহত্তর শক্তির প্রতিযোগিতার অংশ।
এ ধরনের যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য হলো—ক্ষয়। শুধু মানুষ মারা যায় না; ক্ষয় হয় অস্ত্রের, অর্থনীতির, রাজনৈতিক অবস্থানের। উইলিক উল্লেখ করেছেন, মাত্র কয়েক সপ্তাহেই এক বছরের উৎপাদনের বহু গুণ বেশি, শত শত টমাহক মিসাইল ব্যবহার করা হয়েছে। একইভাবে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বড় অংশ খরচ হয়ে গেছে। এই গতিতে যুদ্ধ চলতে থাকলে, বড় শক্তির জন্যও লড়াই টেকসই থাকে না। টেকসইও থাকে না।
এখানেই এসে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড়ায়—এই যুদ্ধ কি এড়ানো যেত? যদি শক্তির ভারসাম্য এতটাই একপক্ষীয় হয়, তাহলে কি সরাসরি সংঘর্ষে না গিয়ে প্রতিপক্ষকে নিবৃত্ত রাখা সম্ভব ছিল না? ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’Ñএই ধারণাটি কি বেশি কার্যকর হতো না? উইলিক এখানে একটি অস্বস্তিকর সত্য তুলে ধরেন—অনেক সময় যুদ্ধ শক্তির অভাব থেকে নয়, বরং শক্তির অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থেকেই শুরু হয়।
ডিকেন্সের গল্পে আমরা দেখি, শাসকরা ভেবেছিল সবকিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসই তাদের পতনের কারণ হয়। আধুনিক বিশ্বেও সেই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—ক্ষমতার প্রদর্শন বাস্তবতার হিসাবকে ঢেকে দিচ্ছে।
ইউক্রেন আর ইরান—এই দুই সংঘাত তাই দুই শহরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। একটিতে প্রতিরোধের গল্প, অন্যটিতে আগাম আঘাতের যুক্তি। একটিতে অস্তিত্বের লড়াই, অন্যটিতে সম্ভাব্য হুমকি ঠেকানোর চেষ্টা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুই ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের জন্য বাস্তবতা একই হয়ে দেখা দেয়। দীর্ঘ যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা আর ক্লান্তি।
ডিকেন্স তার উপন্যাস শেষ করেছিলেন এক ধরনের ত্যাগের মধ্য দিয়ে। সিডনি কার্টনের আত্মত্যাগ সেই সহিংসতার মধ্যেও মানবতার একটি আলো দেখায়। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতায় সেই আলো ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। এখানে ত্যাগ আছে; কিন্তু তা প্রায়ই কোনো বড় অর্থ তৈরি করে না; এখানে জয় আছে, কিন্তু তা স্থায়ী হয় না।
শেষ পর্যন্ত এ তুলনা আমাদের একটি কঠিন সত্যের সামনে দাঁড় করায়—ইতিহাস সরাসরি পুনরাবৃত্তি না হলেও, তার ধরন বারবার ফিরে আসে। ইউক্রেন আর ইরান হয়তো একদিন ইতিহাসের পাতায় পাশাপাশি লেখা হবে, ঠিক ডিকেন্সের দুই শহরের মতো। একটি দেখাবে প্রতিরোধের শক্তি, অন্যটি দেখাবে কোনো এক পরাশক্তির ভুল হিসাবের মূল্য।
আর আমরা যারা এ সময়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি, তাদের জন্য সেই পুরোনো বাক্যটি আবার সত্য হয়ে ওঠে—এটি একই সঙ্গে আশার সময়, আবার ভয়ংকর সময়। আর হয়তো এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ—আমরা জানি এই গল্পের শেষ কোথায় যেতে পারে, তবু আবার সেই পথেই হাঁটছি।
এই জায়গায় এসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর সামনে আসেÑযেটি ডিকেন্স সরাসরি বলেননি, কিন্তু তার গল্পের ভেতরে ছিল—‘ভয়কে কীভাবে রাজনীতি বানানো হয়।’ ফরাসি বিপ্লবের সময় গিলোটিন শুধু শাস্তির যন্ত্র ছিল না; এটি ছিল এক ধরনের বার্তা। কে শত্রু, কে নিরাপদÑসেটি নির্ধারণ করত ক্ষমতাবানরা। আজকের যুদ্ধেও সেই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, শুধু প্রযুক্তি বদলেছে, ভাষা বদলেছে।
ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে যেমন বলা হয়েছিল—এটি একটি নিরাপত্তা অভিযান, তেমনি ইরানকে ঘিরেও বলা হচ্ছে—এটি ভবিষ্যতের হুমকি ঠেকানোর যুদ্ধ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ ধরনের যুক্তি একবার চালু হলে তার শেষ থাকে না। কারণ ‘সম্ভাব্য হুমকি’ এমন একটি ধারণা, যাকে প্রমাণ করা যেমন কঠিন, তেমনি খণ্ডন করাও কঠিন। ফলে যুদ্ধের যুক্তি নিজেই টিকে থাকে। নিজেকে বারবার বৈধতা দেয়।
এই জায়গাটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ এখানে যুদ্ধ আর কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য নয়; যুদ্ধ হয়ে ওঠে এক ধরনের প্রক্রিয়া। ইউক্রেন যুদ্ধ এখন পঞ্চম বছরে—প্রথমদিকে যে দ্রুত সমাধানের কথা বলা হয়েছিল, তা অনেক আগেই মিলিয়ে গেছে। ইরান সংঘাতও যদি একই পথে যায়, তাহলে সেটিও একটি দীর্ঘ, ধীরে ক্ষয় করা যুদ্ধ হয়ে উঠবে।
এর প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। ডিকেন্স দেখিয়েছিলেন, প্যারিসের অস্থিরতা লন্ডনের অর্থনীতি, সমাজ, এমনকি মানসিকতাকেও বদলে দিচ্ছে। আজকের বিশ্বেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপের জ্বালানি বাজার, সামরিক নীতি, জোট রাজনীতি—সবকিছু বদলে দিয়েছে। ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা আবার সেই একই ধাক্কা দিচ্ছে, তবে এবার প্রভাব পড়ছে এশিয়াতেও।
উইলিক একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছেন—এই যুদ্ধগুলো অনেক সময় সেই উদ্দেশ্য পূরণ করে না, যার জন্য শুরু করা হয়। বরং উল্টো ফল দেয়। রাশিয়া ভেবেছিল ইউক্রেন আক্রমণ করলে পশ্চিমা জোট ভেঙে পড়বে; বাস্তবে ন্যাটো আরো শক্তিশালী হয়েছে। একইভাবে ইরান যুদ্ধের সমর্থকরা মনে করেছিলেন, এতে রাশিয়া ও চীনের ওপর চাপ বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কিছু দেশ নতুন করে বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে, কারণ যুদ্ধ তাদের অর্থনীতিকে চাপে ফেলছে।
এখানে একটি গভীর কূটনৈতিক বাস্তবতা কাজ করে—যুদ্ধ শুধু শত্রুকে দুর্বল করে না, মিত্রদেরও ক্লান্ত করে। দীর্ঘ যুদ্ধ মানে শুধু অস্ত্রের ব্যয় নয়; এটি রাজনৈতিক ধৈর্য, অর্থনৈতিক স্থিতি আর জনসমর্থনের ওপরও চাপ ফেলে। ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমর্থন ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়। ইরান যুদ্ধেও সেই একই প্রশ্ন সামনে আসবে—কতদিন, কত দূর, কত খরচে?
এই প্রশ্নগুলোর ভেতরেই উইলিক একটি তুলনা টানেন, যা পুরো আলোচনাটিকে আরো তীক্ষ্ণ করে তোলে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন—ইউক্রেন রাশিয়ার জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন ছিল। জবিগনিউ ব্রেজিনস্কি একসময় বলেছিলেন, ইউক্রেন ছাড়া রাশিয়া ইউরেশীয় শক্তি হতে পারে না। অর্থাৎ রাশিয়ার জন্য এই যুদ্ধ ছিল তাদের ভূরাজনৈতিক অবস্থান রক্ষার লড়াই।
কিন্তু আমেরিকার জন্য ইরান কি তেমন কোনো অস্তিত্বের প্রশ্ন? প্রায় পাঁচ দশক ধরে ইরান শত্রু হয়েও আমেরিকার বৈশ্বিক অবস্থান অটুট থেকেছে। তাহলে এই যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা কতটা বাস্তব আর কতটা রাজনৈতিক?
এই তুলনাটি অস্বস্তিকর, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি যুদ্ধের নৈতিকতা নয়, বরং তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একটি যুদ্ধ কতটা ‘বোঝা যায়’—এই প্রশ্নটিই এখানে কেন্দ্রে চলে আসে।
ডিকেন্সের গল্পে শেষ পর্যন্ত আমরা একটি ব্যক্তিগত ত্যাগ দেখি—সিডনি কার্টনের আত্মবলিদান। সেই ত্যাগ গল্পটিকে একটি অর্থ দেয়, একটি মানবিক পরিণতি দেয়। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতায় সেই জায়গাটি প্রায় অনুপস্থিত। এখানে লাখ লাখ মানুষ ভুগছে, শহর ধ্বংস হচ্ছে, অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে—কিন্তু কোনো একক ত্যাগ এই পুরো প্রক্রিয়াকে অর্থবহ করে তুলতে পারছে না।
বরং যুদ্ধগুলো যেন ধীরে ধীরে নিজের ভেতরেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এক আঘাত আরেক আঘাতকে ডেকে আনে, এক সিদ্ধান্ত আরেক সিদ্ধান্তকে বাধ্য করে। কেউ পুরোপুরি থামতে পারে না, কারণ থামা মানেই দুর্বলতা স্বীকার করা। ফলে যুদ্ধ চলতেই থাকে।
এই জায়গায় এসে ডিকেন্সের সেই প্রথম বাক্যটি আবার ফিরে আসে, তবে এবার অন্য অর্থে। ‘সেরা সময়’ আর ‘নিকৃষ্টতম সময়’ আর আলাদা নয়; তারা একে অন্যের ভেতরে ঢুকে গেছে। প্রযুক্তি এগিয়েছে, রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়েছে, কিন্তু সিদ্ধান্তের ধরন, ভয়, ভুল হিসাব—এসব খুব বেশি বদলায়নি।
ইউক্রেন আর ইরান—দুটি আলাদা যুদ্ধ, দুটি আলাদা প্রেক্ষাপট—তবু তারা যেন একই গল্পের দুই অধ্যায়। একটি দেখাচ্ছে প্রতিরোধ কতটা কঠিন, অন্যটি দেখাচ্ছে আগাম আঘাত কতটা বিপজ্জনক। আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব। সেই বিশ্বে প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রতিধ্বনি অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা থেকেই যায়—আমরা কি সত্যিই নতুন কোনো সময়ের ভেতরে আছি, নাকি পুরোনো গল্পটাই নতুন নামে আবার শুরু হচ্ছে? যদি উত্তর দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে সবচেয়ে বড় বিপদ এখানেই—আমরা জানি এই গল্প কোথায় যেতে পারে, তবু আবার সেই পথেই হাঁটছি।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

