পাটিগণিতের বাইরে এক ভোটযুদ্ধ
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এমন এক রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে ভারতের গণতন্ত্র তার অস্তিত্বের জন্য লড়াই করছে। এই লড়াই কেবল দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কে বাংলা শাসন করবে—এটি কেবল তা নির্ধারণের লড়াইও নয়। এই নির্বাচন ভারত ও ভারতীয়রা কোন মূল্যবোধের প্রতিনিধিত্ব করে, তা নির্ধারণের লড়াই। ভারতের ‘ফেডারেলিজম’ বা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো কি আরো একটি আঘাত সইতে পারবে? ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র কি টিকে থাকবে, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক চৌর্যবৃত্তির মাধ্যমে হিন্দু জাতীয়তাবাদ জয় ছিনিয়ে নেবে? পশ্চিমবঙ্গের যে বহুত্ববাদের সঙ্গে আমরা পরিচিত, শারীরিক ও মৌখিক আক্রমণের মুখেও কি তা টিকে থাকতে পারবে?
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি বনাম তৃণমূলের লড়াইয়ে পুরো ভারত রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে আছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া নিয়ে বিতর্ক, রাস্তায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর আধিক্য এবং রাজনৈতিক স্বার্থে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এই প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন আসলে পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্র এবং প্রকারান্তরে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই। বাঙালি ও ভারতীয়রা কি নিপীড়নের পক্ষ নেবে? উত্তর মিলবে ৪ মে।
বহুত্ববাদের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার
ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অংশের তুলনায় কিছুটা আলাদা। যখন দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ স্থান ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের কেন্দ্র, তখন পশ্চিমবঙ্গ সংস্কারবাদী ও সাহিত্য আন্দোলনের মাধ্যমে এবং ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে এক সমন্বিত সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ পরমহংস, রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও সুভাষচন্দ্র বসুর যে বাংলার কথা আমরা পড়ে বড় হয়েছি, তা গড়ে উঠেছিল মানবতাবাদ, সংস্কারবাদী চিন্তা ও আধুনিকতার ভিত্তিতে। তারা আমাদের এমন এক রাজনীতির বোধ দিয়েছিলেন, যা সব ধর্মের মর্যাদা এবং জাতিগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলে।
সুফিবাদ ও বৈষ্ণব ভক্তিবাদের সংমিশ্রণও এমন এক বাঙালি পরিচয় তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে, যা সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে। বাংলা ঐতিহাসিকভাবে এমন সব শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, যারা একঘেয়ে চিন্তার মাধ্যমে বাংলার স্বকীয়তাকে খর্ব করতে চেয়েছে। তাই এই লড়াই শুধু একটি নির্বাচনের নয়, বরং বাংলার ইতিহাসের।
ধর্মীয় সংখ্যাগুরুবাদী রাজনীতির উত্থান
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানকে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলার রাজনীতির অন্যতম বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হয়। একসময় নগণ্য শক্তি থেকে বিজেপি আজ একটি শক্তিশালী নির্বাচনি শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে বছরের পর বছর কাজ এবং আরএসএসের আদর্শিক প্রচারের মাধ্যমে তারা নিজেদের ভিত্তি শক্ত করেছে। বিজেপি এখন কেবল নির্বাচনে জেতার লক্ষ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; তাদের এই প্রচারণাকে ভারতের জাতীয়তাবাদকে একটি ‘ধর্মীয় সংখ্যাগুরুবাদী’ রূপ দেওয়ার প্রতীকী লড়াই হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
বিজেপির বিরোধীরা মনে করেন, দলটির আদর্শিক অবস্থান বাংলার বহুত্ববাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে খাপ খায় না। অন্যদিকে বিজেপি সমর্থকরা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে চলা দুর্নীতি ও অপশাসনে জর্জরিত ব্যবস্থার হাত থেকে এই দলটিই মুক্তি দিতে পারে। তবে একটি বিষয়ে সবাই একমত—পশ্চিমবঙ্গ এখন ভারতের অন্যতম তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজনৈতিক ময়দান।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক
এবারের নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যু ভোটার তালিকা সংশোধন, যা ‘এসআইআর’ (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন) নামে পরিচিত। এর ফলে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। আদালতের নির্দেশে এই সংখ্যা কমে ২৭ লাখের কাছাকাছি এলেও বিষয়টি নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। অভিযোগ ছিল, এত বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ দেওয়া ভোটারদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেবে। তারা বলেছেন, অনেক বুথে ভোটার বাতিলের হার ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, যা গণতন্ত্র নিয়ে ছিনিমিনি খেলারই নামান্তর।
কেন্দ্রীয়করণ বনাম ফেডারেল স্বায়ত্তশাসন
এই নির্বাচনের দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো—নির্বাচনি ময়দানে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর সরব উপস্থিতি। আধা সামরিক বাহিনীর টহল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলোর তৎপরতা—সব মিলিয়ে বাতাসে এখন জল্পনা ছড়িয়েছে, লড়াইটি আসলে রাজ্য বনাম কেন্দ্রের। ব্রিটিশ আমল থেকেই কেন্দ্রের অতিরিক্ত ক্ষমতাচর্চার বিরুদ্ধে বাংলা রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রদর্শন করেছে। স্বাধীন ভারতেও ফেডারেলিজমের পক্ষে বারবার সুর চড়েছে। ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি কি ধর্মীয় সংখ্যাগুরুবাদী কেন্দ্রীয়করণের দিকে যাচ্ছে, নাকি ভারতের বহুত্ববাদী সংবিধান বিচিত্র পরিচয়ের জায়গা করে দেবে—পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচন তা নির্ধারণ করছে।
মমতা এবং প্রতিরোধের রাজনীতি
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে বাঙালি পরিচয় এবং সাংবিধানিক অধিকারের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছেন। ভোটারদের মেরূকরণের চেষ্টায় তিনি এই নির্বাচনকে ‘ঘরের লোক’ বনাম ‘বহিরাগত’র লড়াই হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। নিজের শাসনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে তিনি সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াইয়ের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন। একজন জননন্দিত ‘স্ট্রিট ফাইটার’ হিসেবে তার ভাবমূর্তি তৃণমূল স্তরে সমর্থন জোগাড় করতে সাহায্য করেছে। তার পদযাত্রা, নির্বাচনি এলাকার সীমানা পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচার তাকে সাধারণ মানুষের কাছে বাঙালি গৌরবের রক্ষক হিসেবে জনপ্রিয় করে তুলেছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিনের শাসনামল তার বিরুদ্ধে ‘অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি’ হাওয়াও তৈরি করেছে। দুর্নীতি ও কর্মসংস্থানের অভাবে ক্ষুব্ধ শহুরে ভোটারদের মন তিনি তার ‘বাঙালি পরিচয়’ কার্ড দিয়ে কতটা জয় করতে পেরেছেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
বিজেপির ক্রমবর্ধমান সাংগঠনিক উপস্থিতি
পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) যে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে এবং এই বিস্তার যে অভাবনীয় দ্রুতগতিতে ঘটেছে, তা কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। কয়েক দশক ধরে যে জেলাগুলোয় বামফ্রন্ট বা আঞ্চলিক দলগুলোর আধিপত্যে ছিল, সেখানে ১০ বছর ধরে বিজেপি সুশৃঙ্খলভাবে বুথভিত্তিক সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, তাদের আদর্শিক প্রচার গভীরতর করেছে এবং রাজ্যজুড়ে তৃণমূল স্তরের সমর্থন সংগঠিত করেছে।
২০১৪ সালে দলটি বাংলা থেকে মাত্র দুটি লোকসভা আসন পেয়েছিল; মাত্র পাঁচ বছর পরে সেই সংখ্যা বেড়ে ১৮-তে পৌঁছায়। নির্বাচনি শক্তির এই নাটকীয় উত্থান ভোটারদের আকস্মিক মনোভাব পরিবর্তনের চেয়ে বরং রাজনৈতিক সংহতির একটি ধারাবাহিক ও সুপরিকল্পিত কৌশলেরই প্রতিফলন।
একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সঙ্গে যুক্ত সংগঠনগুলোও রাজ্যজুড়ে তাদের উপস্থিতি ক্রমাগত বাড়িয়েছে। ধারণা করা হয়, বর্তমানে রাজ্যজুড়ে তাদের হাজার হাজার স্থানীয় ইউনিট সক্রিয় রয়েছে। এই নেটওয়ার্কগুলো আদর্শিক প্রভাব বিস্তার করতে এবং তৃণমূল স্তরে বিজেপির সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বাংলায় বিজেপির জয় হবে দলটির সারা দেশে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টার একটি সার্থক রূপায়ণ; বিশেষ করে এমন একটি রাজ্যে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের সাংস্কৃতিক ও নির্বাচনি প্রভাববলয়ের বাইরে ছিল।
বহিরাগত বনাম ঘরের লোক-আখ্যান
আঞ্চলিক বনাম জাতীয় পরিচয়। নির্বাচনে উভয় পক্ষই প্রচারের মূল সুরকে ‘মমতা বনাম বিজেপি’ হিসেবে তুলে ধরেছে। মমতা নিজেকে এমন একজন নেত্রী হিসেবে তুলে ধরেছেন, যিনি সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে গিয়ে বাঙালি পরিচয় রক্ষা করতে চান; অন্যদিকে বিজেপি বিশ্বাস করে ভারতকে একটি অখণ্ড জাতি হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যেতে, যা দেশি-বিদেশি ‘দেশবিরোধী’ শক্তির হুমকিতে রয়েছে। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই বাংলা সবসময় তার নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয়কে উদ্যাপন করে এসেছে। তাই ভারতের অন্যান্য সাধারণ রাজ্যের মতো কেন্দ্র সরকারের আদেশ বা ফতোয়া মেনে চলতে হবে—এমন ধারণা বাংলা খুব একটা ভালোভাবে গ্রহণ করে না।
নারী ভোটার ও জনকল্যাণমূলক রাজনীতির ভূমিকা
নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে নারী ভোটাররা অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করবেন। তৃণমূল কংগ্রেস কয়েক বছর ধরে মহিলাদের জন্য বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্প (যেমন লক্ষ্মীর ভান্ডার) চালিয়ে আসছে, যা গ্রামীণ এলাকায় তাদের একটি শক্তিশালী নারী ভোটব্যাংক তৈরি করে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অনেক হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আসনে নারী ভোটাররাই জয়-পরাজয় নির্ধারণ করবেন।
সাম্প্রদায়িক মেরূকরণের ছায়া
বাংলার রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক মেরূকরণ একটি অত্যন্ত জটিল ও বিতর্কিত বিষয়। জনমানসে বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক বিভাজন এড়িয়ে চলার জন্য বাংলা দীর্ঘকাল ধরে গর্ব করে এসেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা রাজনীতি সব রাজনৈতিক দলের শব্দকোষেই জায়গা করে নিয়েছে।
ভোটব্যাংকের রাজনীতিতে জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং সীমান্ত অনুপ্রবেশের ভয়কে এমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে জাতীয়তাবাদী বাগাড়ম্বর বা উত্তেজনা ছড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে বিজেপিবিরোধীরা আশঙ্কা করছেন, বাংলা হয়তো তার কয়েক দশকের লালিত ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ বিসর্জন দেওয়ার ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
তাই এই নির্বাচনের ফলাফল শুধু এটাই নির্ধারণ করবে না যে—কারা বাংলাকে শাসন করবে, বরং পূর্ব ভারতজুড়ে প্রকাশ্য জনসভায় বা জনসমক্ষে কোন ধরনের ভাষা বা বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হবে, তাও ঠিক করে দেবে।
নির্বাচনি অনিশ্চয়তা এবং বুথফেরত সমীক্ষার সীমাবদ্ধতা
বুথফেরত সমীক্ষাগুলো বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে একটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস দিয়েছে, যেখানে তাদের সম্ভাব্য ভোটের হারের ব্যবধান খুবই সামান্য। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও লক্ষ করেছেন, এই সামান্য ব্যবধান আসলে ‘মার্জিন অব এরর’ বা সমীক্ষার ত্রুটির সীমার মধ্যেই পড়ে। এছাড়া বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ যাওয়া, বাম ও কংগ্রেস সমর্থকদের মধ্যে ভোট কাটাকাটি এবং গ্রামীণ ভোটের অস্থিরতার কারণে এই ধরনের আগাম পূর্বাভাস যে নির্ভরযোগ্য নয়, তাও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের একটি দিকই নিশ্চিত, আর তা হলো ‘অনিশ্চয়তা’।
ভারতের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে শুধু ভারতের একটি রাজ্যের ভবিষ্যৎ নয়, বরং তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু নির্ধারিত হচ্ছে। যখন ভারতজুড়ে প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন, ফেডারেল ফ্রিডম এবং বহুত্ববাদী পরিসর নিয়ে বিতর্ক ও সংঘাত বাড়ছে, তখন পশ্চিমবঙ্গ ভারতের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের লড়াইয়ে এক ‘ফ্রন্টিয়ার’ বা প্রধান সীমান্ত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যদি বিজেপি জয়ী হয়, তবে তারা প্রকৃত জাতীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছার কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেদের অবস্থান পাকা করে নেবে। আর যদি তৃণমূল জয়ী হয়, তবে তা আধিপত্যবাদী আদর্শকে ঠেকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দলগুলোর ভূমিকাকে আরো শক্তিশালী করবে। কে জিতল তা বড় কথা নয়, এই নির্বাচনের ফল আগামী বছরগুলোয় ভারতের রাজনৈতিক কর্মপন্থা ও গতিপথকে নতুন করে নির্ধারণ করে দেবে।
দক্ষিণ এশিয়ার ওপর প্রভাব
পশ্চিমবঙ্গে কী ঘটছে, প্রতিবেশী বাংলাদেশও তার ওপর কড়া নজর রাখছে। যদি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কোনো বড় পরিবর্তন আসে, তবে তার ঢেউ সীমান্তের ওপারেও গিয়ে লাগবে। বাংলাদেশও গড়ে উঠেছিল বহুত্ববাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং ভাষাগত স্বাধীনতার আদর্শের ওপর ভিত্তি করে। তাই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবের কথা বিবেচনা করে তারা এখানকার পরিস্থিতির দিকে নিবিড়ভাবে খেয়াল রাখছে।
বাংলা ও ভারতের জন্য এক নির্ণায়ক মুহূর্ত
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন কেবল ক্ষমতার রাজনীতির লড়াই নয়। এটি বাংলা ও ভারতের আদর্শিক লড়াই—বহুত্ববাদ বনাম ধর্মীয় সংখ্যাগুরুবাদ, গণতন্ত্র বনাম একনায়কতন্ত্র, ফেডারেলিজম বনাম সেপারেটিজমের লড়াই। ভারতের দীর্ঘ বৈচিত্র্যের ইতিহাস ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র কি কেন্দ্রমুখী জাতীয়তাবাদের এই প্রবল আঘাত সইতে পারবে? ভারতীয় গণতন্ত্র এবং সম্ভাব্যভাবে দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ আজ এক দোদুল্যমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাউথ এশিয়া জার্নালের প্রকাশক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

