চীনের সঙ্গে সম্পর্ক : কূটনৈতিক বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতা

কর্নেল (অব.) মোদাসসের, বীরপ্রতীক

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক : কূটনৈতিক বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আঞ্চলিক শক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতা—বিশেষত ভারত ও চীনের মধ্যে— দেশটির কৌশলগত অবস্থানকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। ভারতের প্রতি দৃশ্যমান অতিরিক্ত অগ্রাধিকার বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্কের সম্ভাবনাকে ক্ষুণ্ণ করছে। একই সঙ্গে সরকারের একাধিক মন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরকে একটি সীমিত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক ইঙ্গিত হিসেবে বিশ্লেষণ করা যায়।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ নীতি অনুসরণ করে আসছে। তবে বাস্তব প্রয়োগে এই নীতি কতটা ভারসাম্যপূর্ণ—তা নিয়ে এখন বিতর্ক তীব্র। আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে দ্রুত পরিবর্তনের ফলে ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য ভারসাম্য রক্ষা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনস্বীকার্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য, জ্বালানি, সংযোগ ও নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা রয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, এই সম্পর্কের কাঠামো ক্রমেই অসম হয়ে উঠছে।

সীমান্তে হতাহতের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত । তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি এখনো অনির্ধারিত। বাণিজ্য ভারসাম্য উল্লেখযোগ্যভাবে ভারতের পক্ষে ।

এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশ কি পর্যাপ্ত কূটনৈতিক দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে পারছে, নাকি অতিরিক্ত সতর্কতা নীতি দুর্বল করে তুলছে?

চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম অবকাঠামো উন্নয়ন অংশীদারদের একটি। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনেশিয়েটিভের আওতায় বাংলাদেশে একাধিক বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে । পদ্মা সেতু সংযোগ সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, অর্থনৈতিক অঞ্চল—সবখানেই চীনা সম্পৃক্ততা দৃশ্যমান।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু প্রকল্পে ধীরগতি এবং নীতিগত পুনর্মূল্যায়ন চীনের কাছে একটি অনিশ্চয়তার বার্তা দিতে পারে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এ ধরনের সংকেত বিনিয়োগ ও আস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে সক্ষম।

মির্জা ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের চীন সফরকে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক অর্জনের দৃষ্টিতে নয়, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তার প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করা অধিক যুক্তিযুক্ত।

এই সফর সম্পর্ক পুনরুজ্জীবনের একটি প্রচেষ্টা হতে পারে । চীনের কাছে বহুমুখী কূটনীতির বার্তা বহন করতে পারে। ভবিষ্যৎ উচ্চপর্যায়ের সংলাপের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

তবে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ফল প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়, যদি না নীতিগত ধারাবাহিকতা ও আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্ব অনুযায়ী ছোট রাষ্ট্রগুলো টিকে থাকে ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যমে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একদিকে ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দরকষাকষির ক্ষমতা কমাতে পারে; অন্যদিকে চীনের সঙ্গে দূরত্ব অর্থনৈতিক সুযোগ সীমিত করতে পারে; ফলে একটি দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে দুর্বল করতে পারে।

বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিকে ‘দুর্বল’ বা ‘তোষণমূলক’ বলে সমালোচনা করা হয়, যা হয়তো আংশিকভাবে অতিরঞ্জিত, তবে পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়।

নীতির দৃশ্যমান ভারসাম্যহীনতা এই ধারণা তৈরি করছে । আন্তর্জাতিক অংশীদাররা সেই ধারণার ভিত্তিতেই তাদের কৌশল নির্ধারণ করে।

সমালোচনাকে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে না দেখে নীতিগত পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে, চীনের সঙ্গে অংশীদারত্ব জোরদার করে, একই সঙ্গে নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করা যায়।

একটি কার্যকর পররাষ্ট্রনীতির জন্য প্রয়োজন স্পষ্ট জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ । নীতির ধারাবাহিকতা এবং বহুমাত্রিক কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা।

পরিশেষে বলা যায়, কূটনীতিতে আবেগের স্থান নেই—এখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তই স্বার্থের নিরিখে বিচার্য। বাংলাদেশ সেই বাস্তবতা কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারবে, সেটিই নির্ধারণ করবে তার ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থান।

লেখক : বীরপ্রতীক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন