সিলেটে শেষ মুহূর্তে জমে উঠেছে ঈদের বাজার। সকাল থেকে সেহরির আগ পর্যন্ত অভিজাত শপিংমল, মার্কেট ও ব্যান্ডের দোকানগুলোতে চলছে বেচাকেনার ধুম। সাধারণত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের টাকায় সিলেটে ঈদের বাজার রমজানের শেষ দশকে জমজমাট হয়ে উঠে। ফলে বিপণিবিতানসহ ছোট-বড় পণ্যসামগ্রীর দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় লেগে আছে।
সিলেটে ১৫ রোজার পর থেকে ঈদবাজারে ভিড় বাড়তে থাকে। তবে গত এক সপ্তাহ ধরে নগরীর মার্কেট, ফ্যাশন হাউস, শপিংমল, ছোটখাটো বিপণিবিতান, হকার্স মার্কেটে দোকানেও ক্রেতাদের সমাগম বেড়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, দুপুর থেকে ক্রেতারা মার্কেট ও শপিংমলে কেনাকাটা করতে আসতে শুরু করেন। ইফতারের আগ পর্যন্ত চলে কেনাকাটা। এরপর ইফতার শেষেই আবার শুরু হয় ক্রেতাদের চাপ। গভীর রাত পর্যন্ত চলে কেনাকাটা।
জানা যায়, এবারের ঈদবাজারে দেশি পণ্যের চাহিদা বরাবরের মতোই বেশি। তবে দীর্ঘদিনের ভারতীয় পণ্যের দাপট এবার কিছুটা কমেছে। এর পরিবর্তে পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও চীনের পোশাকের প্রতি ক্রেতাদের আকর্ষণ বেড়েছে।
বিশেষ করে তরুণীদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে পাকিস্তানি থ্রি-পিস। অন্যদিকে, ছেলেদের পাঞ্জাবি, পায়জামা ও শার্টের পাশাপাশি শিশুদের হরেক ডিজাইনের পোশাকের বিক্রিও তুঙ্গে। তবে দেশি পণ্যের কদর বরাবরের মতোই বেশি। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন নামকরা ব্র্যান্ডের পোশাক ও শাড়ির চাহিদা এবং বিক্রিও বেশি।
ব্যবসায়ীরা জানান, সিলেটে সকাল ১১টা থেকে কেনাবেচা শুরু হলেও বিকেল নাগাদ ভিড় বাড়ে। তবে ইফতার ও তারাবির নামাজের পর মার্কেটগুলোতে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়, যা চলে সেহরি পর্যন্ত। ক্রেতাদের টানতে আলোকসজ্জায় রঙিন করা হয়েছে প্রতিটি বিপণিবিতান।
কয়েকজন ক্রেতা জানান, গত বছরের তুলনায় এবার কাপড়ের দাম অনেক বেশি। ফলে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য পোশাক কেনা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
বিক্রেতারা অবশ্য বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, বিশ্ববাজারে কাপড়ের কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির কারণেই পোশাকের দাম কিছুটা বেড়েছে।
জুতার দোকানদাররা জানান, ঈদকে সামনে রেখে তাদের দোকানেও ক্রেতাদের উপস্থিতি বেড়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন ডিজাইনের জুতা ও স্যান্ডেল কিনছেন ক্রেতারা।
সিলেট নগরীর অভিজাত শপিংমল হিসেবে পরিচিত জিন্দাবাজার এলাকার আল-হামরা শপিং সেন্টার, ব্লুওয়াটার শপিং সিটি, কাকলী শপিং সেন্টার, সিটি সেন্টার, সিলেট প্লাজা, জেলরোড, বারুতখানা এবং বেইলী রোড হিসেবে খ্যাত কুমার পাড়া, নয়াসড়ক রোডের অভিজাত ও ব্যান্ডের ফ্যাশন হাউসগুলোর শোরুমে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা কেনাকাটা করছেন। পাশাপাশি বন্দরবাজার ও হকার্স মার্কেটেও নিম্ন ও নিম্নবিত্ত মানুষের ভিড় লেগে আছে।
নগরীর জিন্দাবাজারের বিপণিবিতান ‘রিয়েল টাচ’-এর পরিচালক উৎপল রায় বলেন, রমজানের শুরুতে ক্রেতা সমাগম কম ছিল। তবে ১৫ রোজার পর ক্রেতা বেড়েছে। তবে এবার ঈদবাজারে মানুষের বাজেট অনেক কম মনে হয়েছে।
নয়াসড়কের ফ্যাশন হাউস মাহা’তে তরুণীদের ভড়ি বেশি। সেখানে থ্রি পিস, টুপিস, শাড়ি, গহনা, পাঞ্জাবীসহ সবধরনের পোষাকই রয়েছে। ম্যানাজার জানান, মানুষজন কেনাকাটা করছেন। আমাদের বিক্রিও অনেক ভালো হচ্ছে।
এবার ভারতীয় পোশাকের আধিপত্য অনেক কম। এই স্থান দখল করে নিয়েছে পাকিস্তানী পোশাক। তরুণীদের এবারের পছন্দের শীর্ষে পাকিস্তানী থ্রিপিস ‘পার্সি’। যেগুলোর দাম পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা।
ঈদের পোশাক কিনতে আসা নগরীর সোনারপাড়ার বাসিন্দা এ্যালি রাশেদ চৌধুরী বলেন, এবার ঈদে কাপড়ের ডিজাইন ও গুণগত মান খুব একটা ভালো মনে হয়নি। নামি-দামি ব্র্যান্ডের ফ্যাশন হাউসগুলোতেও খুব বেশি মানসম্মত কাপড় আসেনি। অনেকে নতুন কিছু না এনে পুরোনো কালেকশনই আবার বিক্রির জন্য এনেছেন। আবার দামও বৃদ্ধি করেছেন।
নগরীর সিটি সেন্টারে ঈদের কেনাকাটা করতে আসা কলেজ ছাত্রী জান্নাতুল মৌমি বলেন, প্রতি বছর ঈদে কোনো না কোনো ট্রেন্ডের পোশাক আসে, যেটা কিনতে সবাই ভিড় করেন। কিন্তু এবার তেমন কোনো ট্রেন্ডি পোশাক আসেনি। তবে পাকিস্তানী ‘পার্সি’ থ্রিপিস আমাদের দৃষ্টি কেড়েছে। এবার সবই গতানুগতিক পোশাক, কিন্তু দাম অনেক বেশি।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলা শাখার মহাসচিব ও সিলেট মহানগর ব্যবসায়ী ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আব্দুর রহমান রিপন জানান, এবার প্রায় সবারই ভালো ব্যবসা হচ্ছে। কারণ ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হওয়ায় ইউরোপ-আমেরিকা থেকে অনেক প্রবাসী দেশে এসেছেন। তখনই ব্যবসায়ীরা ভেবেছিলাম এবার ঈদে ভালো ব্যবসা হবে। কারণ নির্বাচনের পরই রোজা শুরু হওয়ায় এই প্রবাসীরা দেশে ঈদ করবেন। আমাদের ধারণা ঠিক হয়েছে। ফলে এবারের ঈদে ক্রেতা সমাগম অনেক বেশি।
তিনি বলেন, তবে এবার আমরা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে। কারণ সিলেটের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী। এবার বেশিরভাগ ক্রেতার বাজেট সীমিত দেখা গেছে।
অন্যদিকে, প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার কারণে এবার ফুটপাতে তেমন কোন দোকান নেই। তবে কিছু কম দামের দোকান রয়েছে জিন্দাবাজার, বন্দর বাজার এলাকায়। এদিকে, সন্ধ্যার পর বন্দর বাজার এলাকায় কিছু দোকান বসে। সেখানে ভিড় করেন নিম্ন আয়ের লোকেরা।
ঈদ বাজারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, মানুষ যেন নিরাপদে ঈদবাজার করতে পারেন সে জন্য মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও মার্কেটে পুলিশ সদস্যরা ডিউটিরত আছেন। নগরীতে তল্লাশি চৌকি বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া যানজট নিরসনে অতিরিক্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে সাদা পোশাকেও পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

