মৌলভীবাজারে কৃষিজমির একটি বড় অংশ এখনও পতিত অবস্থায় পড়ে আছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, স্থায়ী অনাবাদি পতিত জমির পরিমাণ ১৩ হাজার ১০৬ হেক্টর। প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি পতিত, সেচ ও প্রশাসনিক দুর্বলতা কৃষকের আস্থাহীনতা বাড়াচ্ছে। অথচ বিশেষজ্ঞদের মতে, সামান্য উদ্যোগ নিলেই এ জমি হতে পারে খাদ্য ভাণ্ডারের নতুন দিগন্ত।
কৃষি বিভাগের তথ্য ও মাঠপর্যায়ের কৃষকদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী পতিত জমির কারণগুলো হলো, পর্যাপ্ত সেচ সুবিধার অভাব ও খরচ বৃদ্ধি, জমির মালিকদের প্রবাসে অবস্থান ও জমির প্রতি অনাগ্রহ, গরু-ছাগলের অবাধ বিচরণে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি গ্রহণে অনীহা, কৃষি দপ্তরের নজরদারির ঘাটতি।
জেলার আবাদযোগ্য স্থায়ী অনাবাদী পতিত জমির পরিমাণ ১৩ হাজার ১০৬ হেক্টর। তবে মৌসুমভিত্তিক আবাদ না হওয়া জমি যোগ করলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৭০ হাজার হেক্টরের বেশি। এত বিপুল পরিমাণ জমি অনাবাদি থাকা শুধু কৃষির উন্নয়নকেই বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং পুরো জেলার অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এরমধ্যে সদর ১৪৫০ হেক্টর, শ্রীমঙ্গল ২৩৮১ হেক্টর, রাজনগর ৮২৫ হেক্টর, কমলগঞ্জ ২০৫০ হেক্টর, কুলাউড়া ২৭৫০ হেক্টর, বড়লেখা ২৩৫০ হেক্টর ও জুড়ী উপজেলায় ১৩০০ হেক্টর।
রবি মৌসুমের আবাদ যোগ্য পতিত জমি জেলায় ৩৭৭৮১ হেক্টর রয়েছে । এর মধ্যে সদর উপজেলার ৭২৭৭ হেক্টর, শ্রীমঙ্গল ৬৪৩৮, রাজনগর ৩০৮১ হেক্টর, কমলগঞ্জ ৯৯৩৮ হেক্টর, কুলাউড়া ৭৭৭২ হেক্টর, বড়লেখা ১৬২২ হেক্টর ও জুড়ী উপজেলার ১৬৬১ হেক্টর হেক্টর।
খরিপ-১ মৌসুমের আবাদযোগ্য পতিত জমির পরিমাণ সারা জেলায় ৫৩৯০৬ হেক্টর। এরমধ্যে সদর উপজেলায় ৯৬৯১ হেক্টর, শ্রীমঙ্গল ৮৭৩৮ হেক্টর, রাজনগর ৫৩ ৮১ হেক্টর, কমলগঞ্জ ১২৭৪১ হেক্টর, কুলাউড়া ১০০৭২ হেক্টর, বড়লেখা ৩৬২২ হেক্টর ও জুড়ী উপজেলায় ৩৬৬১ হেক্টর।
খরিপ-২ মৌসুমের আবাদযোগ্য পতিত জমির পরিমাণ সারা জেলায় ১৯০১ হেক্টর। এরমধ্যে সদরে ৩৩৫ হেক্টর, শ্রীমঙ্গলে ২৯৫ হেক্টর, রাজনগর ২৪৬ হেক্টর, কমলগঞ্জ ৩২৫ হেক্টর, কুলাউড়া ৩৭৫ হেক্টর, বড়লেখা ১৭০ ও জুড়ী উপজেলায় ১৫৫ হেক্টর ।
হাওরে কৃষিজমি কমে যাওয়ার কারণ: ভূমি দখল ও ছড়ার মুখ বন্ধ করে অবৈধ দখল, বালু উত্তোলন, কৃষিজমিতে মৎস্য খামার স্থাপন, পাহাড়ি ঢলে জমিতে বালির স্তর জমা হওয়া, অতিরিক্ত কচুরিপানা জমে থাকা।
জেলার সদর উপজেলার কৃষক আব্দুল হক বলেন, সেচ সুবিধা থাকলে পতিত জমি আবাদ করা যেত। কিন্তু খরচ বেশি, আর সুবিধা কম হওয়ায় জমি ফাঁকা পড়ে যায়।
কমলগঞ্জের কৃষক মিজানুর রহমান অভিযোগ করেন, ধান করতে চাইলে গরু-ছাগল নষ্ট করে ফেলে। এজন্য অনেকেই আবাদে আর আগ্রহী না।
অন্যদিকে কুলাউড়ার কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, কৃষি অফিস শুধু হিসাব নেয়, মাঠে এসে সমস্যার সমাধান করে না। এ কারণে জমি আবাদে ফেরানো কঠিন হয়ে যায়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ডি ডি কৃষিবিদ মো. জালাল উদ্দীন জানান, মৌলভীবাজারে পতিত জমির পরিমাণ বেশি হলেও সঠিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে এগুলো আবাদে ফেরানো সম্ভব। সেচ অবকাঠামো, আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃষকের অংশগ্রহণ একসাথে হলে কৃষি উৎপাদনে বড় অগ্রগতি আসবে।
তিনি পতিত জমি আবাদে ফেরাতে কয়েকটি সুপারিশ করেছেন, এলএলপি, ফিতাপাইপ, সোলারচালিত সেচযন্ত্র ও ড্রিপ ইরিগেশন পদ্ধতির ব্যবহার। ছোট পুকুর খনন বা পুরনো জলাশয় সংস্কার করে সেচ নিশ্চিত করা। আউশ আবাদ বৃদ্ধির জন্য প্রণোদনা ও ভর্তুকি বৃদ্ধি। কৃষক উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম (উঠান বৈঠক, মাঠ দিবস, প্রশিক্ষণ, দলবদ্ধভাবে কাজ)। দখল হয়ে যাওয়া ভূমি উদ্ধার, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ ও কচুরিপানা পরিষ্কার।
তবে স্থানীয় অনেক কৃষক মনে করেন, জেলা কৃষি দপ্তরের গাফিলতি, জেলা প্রশাসনের দুর্বল ভূমিকা ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট উদ্যোগের অভাবেই এত বড় পরিমাণ জমি আবাদে ফেরানো যাচ্ছে না। তারা দাবি করছেন, সমন্বিত পরিকল্পনা ও শক্ত পদক্ষেপ ছাড়া মৌলভীবাজারের কৃষিতে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়।
কৃষি অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ড. জাহিদুল হক মনে করেন, পতিত জমি পুনর্ব্যবহারে সেচ অবকাঠামোই মূল চাবিকাঠি। সোলারচালিত সেচযন্ত্র সরকারি ভর্তুকিতে দেওয়া গেলে কৃষকেরা আবার জমি আবাদে ফিরবেন।
ধান গবেষণা বিজ্ঞানী ড. নাসরিন আক্তার বলেন, হাওরাঞ্চলে পতিত জমি ভুট্টা, ডাল ও তিল উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। ধানের বাইরে বহুমুখী চাষাবাদ করলে কৃষকের আয় বহুগুণ বাড়বে।
মৌলভীবাজারের কৃষি খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে পতিত জমি আবাদে আনার বিকল্প নেই। সেচ অবকাঠামো উন্নয়ন, বহুমুখী ফসল চাষ, প্রশাসনিক উদ্যোগ ও কৃষক সমবায়—এই চারটি স্তম্ভের উপর নির্ভর করছে জেলার কৃষির ভবিষ্যৎ।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পতিত জমি আবাদে ফিরিয়ে আনা গেলে মৌলভীবাজার কেবল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে না, বরং জাতীয় খাদ্য উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

