একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষা

ঝুলে আছে সুনামগঞ্জের ১৩ নদী পুনঃখনন প্রকল্প

ঝুলে আছে সুনামগঞ্জের ১৩ নদী পুনঃখনন প্রকল্প
নাব্য সংকটে সুনামগঞ্জের হাওড়ে জেগে উঠছে চর । আমার দেশ

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ নদী পুনঃখননে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প প্রস্তাবনা এখনো ঝুলে আছে পরিকল্পনা কমিশনে। হাওড়ের নদীগুলোর নাব্য ফিরিয়ে আনতে জেলার ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ নদী পুনঃখননের একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। তবে দুবছর পার হলেও প্রকল্প প্রস্তাবটি এখনো পরিকল্পনা কমিশনে ঝুলে আছে। দ্রুত প্রকল্পটি একনেকে তোলার দাবি জানিয়েছেন হাওড়বাসী।

জানা গেছে, দীর্ঘদিনেও সুনামগঞ্জের হাওড়াঞ্চলের ১৩ নদীর নাব্য সংকট নিরসনে নেওয়া উদ্যোগ কার্যকর হচ্ছে না । ফলে নতুন বোরো মৌসুম ঘনিয়ে এলেই সুনামগঞ্জের হাওড়াঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে বাড়তে থাকে উৎকণ্ঠা। শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় পানি না পাওয়া, আবার বর্ষা ও আগাম বৃষ্টিতে নদীর পানি দ্রুত হাওড়ে ঢুকে পড়াÑএ দুই ধরনের সংকট নিয়েই বছরের পর বছর চাষাবাদ করছেন কৃষকরা । এ বাস্তবতায় ২০২৪ সালে জেলার ১৩টি নদী পুনঃখননের উদ্যোগ নেয় পাউবো। প্রকল্পটি ২০২৬ সাল থেকে শুরু করে তিন বছরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু অনুমোদন না হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।

বিজ্ঞাপন

কৃষক ও হাওড় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীগুলোর নাব্য ফিরিয়ে আনা না গেলে সেচ, পানি নিষ্কাশন ও জলাবদ্ধতার সংকট আরো প্রকট হতে পারে। পলি জমে সংকুচিত হয়ে নদীর প্রবাহ কমে গিয়ে সুনামগঞ্জের হাওড়াঞ্চলের অনেক নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এতে নদীর গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে । শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজন অনুযায়ী পানিপ্রবাহ না থাকায় হাওড়ের বিভিন্ন এলাকায় সেচের সমস্যা তৈরি হয়।

অন্যদিকে বর্ষা ও আগাম বৃষ্টির সময় নদীতে পানির চাপ বাড়লে দ্রুত পানি হাওড়ে প্রবেশ করে। কোথাও কোথাও পানি নামার পথ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দীর্ঘসময় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব পড়ে কৃষিজমি প্রস্তুত, বোরো আবাদ এবং ফসল সংগ্রহে।

গত বোরো মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় দেখার হাওড় এলাকায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, মহাসিং নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশন হতে পারেনি। এতে হাওড়ের পানি নিয়ন্ত্রণ এবং ফসল রক্ষায় স্থানীয়ভাবে উথারিয়া বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ওই বাঁধকে কেন্দ্র করে দেখা দেয় মতবিরোধ। একপক্ষ পানি চলাচলের জন্য বাঁধ কেটে দেওয়ার দাবি জানায়। অন্যপক্ষ ফসল রক্ষার স্বার্থে বাঁধ বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়। পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়লে প্রশাসনকে বিষয়টি নিয়ে হস্তক্ষেপ করতে হয়। শেষ পর্যন্ত গত বছর বাঁধ কেটে দেওয়া হয়। কৃষকদের অভিযোগ, এর আগেই জলাবদ্ধতায় শত শত একর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এভাবে অসংখ্য হাওরে জলাবদ্ধতায় তলিয়ে ফসল পচে যায়। তবে মহাসিং নদী খনন থেকে বাদ পড়ায় কৃষকদের মাঝে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।

জগন্নাথপুর উপজেলার কৃষক আলী আসগর ইমন বলেন, জেলার প্রতিটি নদী নাব্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। ফসল ঘরে তোলার সময় জলাবদ্ধতায় ডুবে যায়। তখন কৃষকের চোখে-মুখে হাহাকার চলে। এক মৌসুমের ক্ষতি সামলাতে কয়েক বছর লাগে।

বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম ছদরুল বলেন, পুরো হাওড়াঞ্চলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে উপেক্ষা করে নির্মিত অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট ও অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণের ফলেই মূলত নাব্য সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। হাওড়াঞ্চলের কৃষকদের একমাত্র বোরো ফসল রক্ষায় নদী-নালা, খাল-বিল পুনঃখনন এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা স্বাভাবিক করার বিকল্প নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।

দিরাই উপজেলার কৃষক ও হাওড় মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন পরিষদের সদস্য সচিব একে কুদরত পাশা বলেন, জলাবদ্ধতায় হাওড় ডুবে ফসলহানি ঘটে। নদীগুলো খনন হলে হাওড়ে জলাবদ্ধতা কমবে। কৃষকদের দুর্ভোগ কমবে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদুল হক বলেন, আবুয়া, পাটলাই, সুরেশ্বরী, সুরমা নদীসহ ১৩ নদী খননের প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে দেওয়া আছে। সরকার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। আশা করছি অতি অল্প সময়ের মধ্যে একনেকে অনুমোদন হবে। আগামী বোরো মৌসুমের আগেই নদী খননের কাজ শুরু করতে পারব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন