ওসমানীনগরে ভোটকেন্দ্র, বাজার ও জনবহুল এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইউএনও মুনমুন নাহার আশা ও তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের বিরুদ্ধে। প্রকল্পের বরাদ্দ অর্থের স্বচ্ছতা, কাজের বাস্তবায়ন ও ঠিকাদার নির্বাচন প্রক্রিয়ায় গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। জানা যায়, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সারা দেশের ন্যায় এ উপজেলাতেও নির্বাচনি নিরাপত্তা জোরদারের অংশ হিসেবে ভোটকেন্দ্র, বাজার ও জনবহুল এলাকায় সিসিটিভি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে ইউনিয়ন পরিষদের করের ১ শতাংশ তহবিলের আওতায় মোট ৩৮ লাখ ১৪ হাজার ৯৯৭ টাকার প্রকল্প প্রস্তাব দাখিলের জন্য গত ১৮ ডিসেম্বর চেয়ারম্যানদের মৌখিক নির্দেশনা দেন ইউএনও।
উপজেলার ৫৪টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি কেন্দ্রে ছয়টি করে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনে ছয় লাখ ৫৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, এ বরাদ্দের অর্থে কোনো কাজ না করেই গত ১০ ফেব্রুয়ারি উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে অগ্রিম বিল হিসেবে উত্তোলন করেন ইউএনও মুনমুন নাহার আশা। বিষয়টি উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা অনিমেশ পাল নিশ্চিত করেছেন।
নির্বাচন কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ ছয়টি সিসি ক্যামেরা স্থাপনে ব্যয় ধরা হয় ৩২ হাজার ৮০০ টাকা। সে হিসেবে ৫৪টি ভোটকেন্দ্রে মোট ব্যয় হওয়ার কথা ১৭ লাখ ৭১ হাজার ২০০ টাকা। অথচ ইউনিয়ন পরিষদের ১ শতাংশ খাত থেকে ৪৪ লাখ ৭০ হাজার ৯৯৭ টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যা প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় অনেক বেশি। এছাড়া নির্বাচন কমিশনের ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ ছয় লাখ ৫৬ হাজার টাকারও কোনো সুস্পষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি। এছাড়া উপজেলায় আগ থেকে সিসিটিভি থাকা কেন্দ্রেও নতুন করে বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ক্যামেরা স্থাপনের প্রকল্প থাকলেও সেটিও করা হয়নি।
ইউএনওর এমন দুর্নীতির বিষয়টি উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদে জানাজানি হলে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বাজার ও জনবহুল এলাকায় রাতের আঁধারে ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শুরু করা হয়। সর্বশেষ ২২ ফেব্রুয়ারি তাজপুর বাজারে বনফুলের সামনে একটি ক্যামেরা বসানো হয়। দুর্নীতির সবচেয়ে আলোচিত জায়গা হচ্ছে চেয়ারম্যান ও প্রশাসকদের জেলা প্রশাসকের দোহাই দিয়ে ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। কাগজে-কলমে প্রতিটি ইউনিয়নে পৃথক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেখানো হলেও বাস্তবে কাজ সম্পন্ন করেছেন ইউএনওর ঘনিষ্ঠ এক আত্মীয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা পরিষদের এক কর্মকর্তা জানান, ইউএনওর নিজ এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ঠিকাদার ফখরুল ইসলামের মালিকানাধীন ‘মেসার্স সাইফুল এন্টারপ্রাইজ’ নামের প্রতিষ্ঠানই মূলত কাজগুলো বাস্তবায়ন করেছে। তিনি আরো দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ইউএনওর সরকারি বাংলোতে অবস্থান করে কাজ সম্পন্ন করেন। অন্যদিকে প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী কাজের বিল উত্তোলনের ক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চেয়ারম্যান/প্রশাসকের কাছে বিল দাখিল করার কথা থাকলেও জেলা প্রশাসক, সিলেটের নিয়োগের অজুহাত দেখিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের কাছে বিল চান ইউএনও।
একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে চেয়ারম্যানরা বিলে স্বাক্ষর করেন এবং ইউনিয়নপরিষদের চেক ইউএনও কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত ঠিকাদারের নামে ব্যাংকে জমা দিতে বাধ্য হন।
বিলে সই না করলে চেয়ারম্যান পদে থাকার বিষয়টি ‘দেখে নেওয়া হবে এমন হুমকিও দেন তাজপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. কবির আহমদকে। তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ঠিকাদার নিয়োগে চেয়ারম্যানদের কোনো কার্যকর ভূমিকা ছিল না।
মেসার্স সাইফুল এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর ফখরুল ইসলাম বলেন, ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি বসানো হয়েছে, বাজারে পরে বসানো হবে। ইউএনওর আত্মীয় হওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। অভিযোগ অস্বীকার করে ইউএনও মুনমুন নাহার আশা বলেন, নির্বাচনকালীন এই প্রকল্প জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। কোন দুর্নীতি হয়নি। ঠিকাদার একই হলেও সে আত্মীয় নয় বলে দাবি করেন।
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম জানান, পুরো প্রক্রিয়া ইউএনওর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের ১ শতাংশ বরাদ্দ সব ইউনিয়ন থেকে নেওয়ার কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

