আ.লীগ নেতাদের সন্ত্রাসী তৎপরতায় উত্তপ্ত সিকন্দরপুর পশ্চিমগাঁও

নুরুল ইসলাম রেফুল, ওসমানীনগর (সিলেট)

আ.লীগ নেতাদের সন্ত্রাসী তৎপরতায় উত্তপ্ত সিকন্দরপুর পশ্চিমগাঁও

কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা, ক্ষমতা, অবৈধ অস্ত্র ও পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রভাববলয়ের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে ফের অশান্ত হয়ে উঠেছে সিলেটের আলোচিত গ্রাম সিকন্দরপুর পশ্চিমগাঁও। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রভাবশালী দুই গোত্রের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাতে আতঙ্কে দিন কাটছে এলাকাবাসীর। অবৈধ অস্ত্রের মহড়া, গুলিবর্ষণ ও সন্ত্রাসী তৎপরতার মধ্যেও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তায় গ্রামজুড়ে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও উমরপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শফিকুল ইসলাম বলয়ের সঙ্গে সাবেক ইউপি সদস্য হাজী নুর হোসেন পক্ষের দীর্ঘদিনের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ চলে আসছে। এ বিরোধে একাধিকবার সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, তিনটি হত্যাকাণ্ডসহ প্রাণনাশের হুমকি প্রদানের ঘটনা অহরহ চলছে।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘদিনের এ সংঘাতে দুই পক্ষের দায়ের করা ডজনখানেক মামলায় কয়েকশ ব্যক্তি আসামি, বহুবার প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন, গুলিবর্ষণ ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কেউ কারাভোগ করেছেন, অনেকে এখনো আত্মগোপনে রয়েছেন। সর্বশেষ ২৮ জুন বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় হাজী নুর হোসেনের পক্ষে সিলেট আদালতে আরো একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। একাধিক সালিশি সভা হলেও বিরোধের কার্যকর সমাধান হয়নি।

গত ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গোলাম কিবরিয়া আত্মগোপনে গেলে গ্রামে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। একই সময় শফিকুল ইসলামও নীরব ছিলেন। তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গোলাম কিবরিয়ার পুনরায় সক্রিয় উপস্থিতির সঙ্গে শফিকুল ইসলামও সক্রিয় হয়ে ওঠায় পুরোনো আতঙ্ক ফিরে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, গোলাম কিবরিয়া ও শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী গত ১৫ দিনে একাধিক বাড়িতে হামলা, লুটপাট ও প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিয়েছে। ৩১ মে হাজী নুর হোসেনের বাড়ি এবং ২৪ জুন কেয়ারটেকার সুবোধ সূত্রধরের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, গুলিবর্ষণ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ২৬ জুন সুবোধের বাড়ির একমাত্র চলাচলের রাস্তা দেয়াল তুলে বন্ধ করে দেওয়ায় বাসিন্দারা কার্যত গৃহবন্দি।

দুই বাড়ির সিসিক্যামেরার ফুটেজে হামলা ও আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় শিবলু মিয়া, নাদিমুল হক জয়, দিলশাদুর রহমান ডায়মন্ড, যুবলীগ ক্যাডার আক্কাস আলী ও তফজ্জুল ইসলাম টিটুসহ কয়েকজনকে দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের বিরুদ্ধে চুরি, ছিনতাই ও ইয়াবা ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

অতীতে আওয়ামী লীগের দুই প্রভাবশালী গোত্রের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একাধিকবার পুলিশের অস্থায়ী ক্যাম্প বসানো হয়। পুলিশ-সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযানে বিপুল অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার এবং একাধিক অস্ত্রধারীকে আটক করা হয়।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে ওসি ও সার্কেল কর্মকর্তাসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একাধিকবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অবৈধ অস্ত্র প্রদর্শনের প্রাথমিক সত্যতা পেলেও অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার কিংবা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি পুলিশ। ফলে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন হাজী নুর হোসেন ও সুবোধ সূত্রধর।

সুবোধ সূত্রধর বলেন, পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। পুলিশ চলে যাওয়ার পর হামলাকারীরা আবার ভাঙচুর চালায়। রাস্তা বন্ধ করে এবং শ্মশানের ওপর দিয়ে ড্রেন নির্মাণ করে তাদের উচ্ছেদের চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

অভিযোগ অস্বীকার করে গোলাম কিবরিয়া জানান, তিনি চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আছেন এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তিনি নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন।

সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ওসমানীনগর সার্কেলের কর্মকর্তা অস্ত্রের মহড়া ও গুলাগুলির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অভিযুক্তরা পাশের হাওর এলাকা ব্যবহার করে পালিয়ে যায়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, সিকন্দরপুর পশ্চিমগাঁওয়ে স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান এবং অস্ত্রধারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও হামলা-সন্ত্রাসের মূল হোতাদের শনাক্তে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনেরও দাবি তাদের।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন