প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় দেশের বাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে আমদানি করা আপেল, কমলা, মাল্টা ও আঙুর ফল। একসময় রোগীর পথ্য বা পুষ্টির উৎস হিসেবে পরিচিত ফলগুলো এখন সাধারণ মানুষের পক্ষে ক্রয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে ফলের উচ্চ মূল্যবৃদ্ধিতে চড়া শুল্কহার, সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধা এবং বিলাসবহুল পণ্যের তালিকায় যুক্ত থাকা-এ তিন কারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তাজা ফলকে বিলাসবহুল পণ্যের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে জরুরি নিত্যপণ্যের অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে কমিশন। একই সঙ্গে ফলের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে তিনটি কৌশলগত পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
সম্প্রতি সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে ফলের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত ও বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় ট্যারিফ কমিশনের পক্ষ থেকে আমদানিকৃত ফলের মূল্য ও বাজার পরিস্থিতির উপর একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। সে প্রতিবেদনে
বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশে বেশি দামে ফল বিক্রি হচ্ছে। একই ধরনের ফলগুলো ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের চেয়ে কম দামে বিক্রি হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার ফলের দামের তুলনা
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি কেজি আপেলের দাম ২৮০ থেকে ৩৮০ টাকা। অথচ ভারতে ১৫০ থেকে ২২০ টাকা, পাকিস্তানে ১১০ থেকে ১৭০ টাকা। বাংলাদেশে প্রতি কেজি মাল্টা ২৪০ থেকে ৩২০ টাকা। যদিও বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি মাল্টার দাম ৫২০ থেকে ৫৫০ টাকা। সেখানে ভারতে প্রতি কেজি মাল্টার দাম ১০০ থেকে ১৬০ টাকা। পাকিস্তানে প্রতি কেজি মাল্টার দাম ৮০ থেকে ১৩০ টাকা। আর নেপালে প্রতি কেজি মাল্টার দাম ১৩০ থেকে ১৮০ টাকা। বাংলাদেশে প্রতি কেজি কমলার দাম ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা। সেখানে ভারতে ৯০ থেকে ১৫০ টাকা, পাকিস্তানে ৭০ থেকে ১২০ টাকা এবং নেপালে ১২০ থেকে ১৭০ টাকা। প্রতি কেজি আঙুরের দাম দেশে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। আর ভারতে ১৩০ থেকে ২০০ টাকা, পাকিস্তানে ১০০ থেকে ১৬০ টাকা, নেপালে ১৫০ থেকে ২৩০ টাকা।
তিন কারণে অস্থির ফলের বাজার
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—আমদানি করা এসব ফলের উচ্চমূল্য এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার পেছনে বড় তিনটি কারণ রয়েছে। এসব ফল জরুরি পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি পূরণে বছরের পর বছর সহায়ক ভূমিকা রাখলেও বছর দুয়েক আগে এটিকে বিলাসবহুল পণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। এ কারণে আমদানির ওপর আরোপ করা হয় উচ্চ কর। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রকৃত বুকিং দরের চেয়ে কাস্টমসে বেশি মূল্যে শুল্কায়ন করা। একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক আমদানিকারক এসব পণ্য আমদানি করেন এবং তাদের হাতেই বাজার নির্ভরশীল। এছাড়া হিমাগারের সংকটের কথাও বলা হয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি ও প্রবিধি বিভাগ থেকে জারি করা একটি সার্কুলারে বিলাসজাতীয় পণ্যের তালিকায় যুক্ত করা হয় এসব ফলকে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ উৎপাদিত ফলের বাজারের সুরক্ষায় শতভাগ মার্জিন সংরক্ষণ করে আমদানির নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই ফলের দাম বাড়তে থাকে লাগামহীনভাবে।
ট্যারিফ কমিশন বলছে, বর্তমানে এসব ফল আমদানিতে ৯৬.১০ থেকে ১২১.৭৮ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। যার মধ্যে কাস্টমস ডিউটি (সিডি), সম্পূরক শুল্ক (এসডি), মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), অগ্রিম আয়কর, রেগুলেটরি ডিউটি এবং অগ্রিম কর। অর্থাৎ যত ধরনের কর রয়েছে তার প্রায় সবই দেওয়া হয়েছে ফল আমদনির ওপর। এর সঙ্গে আরো সংকট তৈরি করেছে ইচ্ছামতো দামে শুল্কায়ন করা।
মূল্য নিয়ন্ত্রণে কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা
এই পরিস্থিতির সমাধানে ট্যারিফ কমিশন বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে প্রথমেই বলা হয়েছে শুল্ক কাঠামো যৌক্তিকীকরণের বিষয়ে। কমিশন বলছে, বিলাসজাতীয় পণ্যের তালিকা থেকে বের করে তাজা ফল ও খেজুর জরুরি নিত্যপণ্যে রূপান্তর এবং নিয়ন্ত্রণমূলক ও সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা উচিত। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় নিয়ে শুল্কায়নের পাশাপাশি তাজা ফলকে পচনশীল বিবেচনায় গ্রিন চ্যানেলের মাধ্যমে খালাসের ব্যবস্থার গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের এলসি সুবিধা সহজ করে হিমাগার সুবিধার আওতা বাড়ানোর বিষয়েও সুপারিশ তুলে ধরেছেন কমিশন।
চাহিদা, উৎপাদন ও আমদানি পরিস্থিতি
জানা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৫ থেকে ৬ লাখ টন আমদানিকৃত তাজা ফলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে মাল্টা ও আপেলের চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। দেশীয় মোট ফলের ৭৭ শতাংশই আপেল ও মাল্টার চাহিদা রয়েছে। পবিত্র রজমান ও ধর্মীয় উৎসব বিবেচনায় খেজুরের বার্ষিক চাহিদা রয়েছে ১ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টন। আপেল, মাল্টা, কমলা, আঙুর এবং খেজুর দেশের জলবায়ু ও বাণিজ্যিক কারণে অত্যন্ত সীমিত পরিমাণে উৎপাদিত হয়। ফলে অভ্যন্তরীণ এই চাহিদার ৯৫ থেকে ৯৯ শতাংশই আমদানি করতে হয়। চীন, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ব্রাজিল, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এসব ফলের বড় অংশ আমাদনি হয়।
সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী মাল্টার অস্বাভাবিক দামের কারণ অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে। একই সঙ্গে মাল্টার বর্তমান বাজারদাম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। অস্বাভাবিক দামে মাল্টা বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ দেওয়া হবে না।’
সভা সূত্রে জানা গেছে, খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানোর বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে সুপারিশ করবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের মাল্টা আমদানির ওপর থাকা শুল্ক কমানোর পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে।
সভায় ব্যবসায়ীরা জানান, মাল্টার বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ সরবরাহের ঘাটতি। তাদের হিসাবে, কোনো কোনো সপ্তাহে দেশে মাত্র ১২ থেকে ২৯ কনটেইনার মাল্টা এসেছে। অথচ স্বাভাবিক চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন প্রায় ১৫ কনটেইনার মাল্টার প্রয়োজন হয়। উচ্চ শুল্ক, পরিবহন ব্যয়, জাহাজ ও বন্দরের জটিলতা এবং আগের চালানে লোকসানের কারণে অনেক ব্যবসায়ী মাল্টা আমদানি কমিয়ে দিয়েছেন বলেও জানান আমদানিকারকরা। পচনশীল পণ্য হওয়ায় পরিবহন ও সংরক্ষণ পর্যায়ে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকিও রয়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।
সভায় এনবিআরের প্রতিনিধি জানান, বর্তমানে বিভিন্ন মান ও গ্রেডের খেজুরের প্রকৃত ক্রয়মূল্য আলাদা হলেও শুল্কায়নের ক্ষেত্রে সেই পার্থক্য সব সময় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। এ কারণে বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারদর ও উৎসমূল্য বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।
সভায় ব্যবসায়ীরা বিকল্প উৎস থেকে মাল্টাসহ বিভিন্ন বিদেশি ফলের আমদানি বাড়ানোর আশ্বাস দেন। সরকারের পক্ষ থেকেও শুল্ক-কর, শুল্কায়ন ও আমদানি প্রক্রিয়ায় যৌক্তিক সমস্যাগুলো পর্যালোচনার কথা জানানো হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

