আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ নতুন সরকারের

সরদার আনিছ

নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ নতুন সরকারের
ছবি: সংগৃহীত

রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগের পাশাপাশি বাজার মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা জোরদার করেছে নতুন সরকার। সারা দেশে ভোক্তা অধিকার ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বাজারে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম দিনে রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার আহ্বান জানিয়ে ব্যবসায়ীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, রমজানের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে রমজানকে ব্যবসায় মুনাফা লাভের মাস হিসেবে পরিগণিত করবেন না। দ্রব্যমূল্য যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায়, এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করুন।

এছাড়া গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সরকারের পরিকল্পিত ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনদিনের মধ্যে এ কমিটি প্রতিবেদন জমা দেবে বলে জানিয়েছেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। মন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে চালু থাকা বিভিন্ন কার্ড ও ভাতা কর্মসূচির তুলনায় ফ্যামিলি কার্ডের আর্থিক সহায়তা দ্বিগুণেরও বেশি হবে। তবে বিদ্যমান কার্ড ও ভাতা কার্যক্রম চলমান থাকবে এবং নতুন ফ্যামিলি কার্ড সর্বজনীনভাবে বিতরণ করা হবে।

বিজ্ঞাপন

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন প্রথম কার্যদিবসে গত বুধবার রমজান মাসকে সামনে রেখে মজুতদার ও বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন। এছাড়া বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও দপ্তর প্রধানদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে কর্মকর্তাদের কাজের গতি বাড়ানোর আহ্বান জানান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, আমাদের হাতে অনেক কাজ, নষ্ট করার মতো সময় হাতে নেই। সময় নষ্ট করার জন্য দেশের মালিকরা (জনগণ) আমাদের এখানে পাঠাননি।

আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাইরে থেকে অনেকে মনে করেন দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অনেক বড়, এর বহুমুখী কার্যক্রম আছে। আগামীদিনে আমাদের কাজের অগ্রাধিকার থাকবে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ডেফার করা। বিনিয়োগের মাধ্যমে আনইমপ্লয়মেন্টের জায়গায় হিট করা। রপ্তানি বাস্কেট যেন বড় করতে পারি সে প্রচেষ্টা আমাদের থাকবে, কেননা এটি আমাদের ন্যাশনাল সিকিউরিটির সঙ্গে সম্পৃক্ত।’ এ সময় বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।

সরকারের এমন কঠোর হুঁশিয়ারির পর সারা দেশে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকদের সহযোগিতা নিয়ে অভিযান পরিচালনা করছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মান, মূল্য ও বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গতকাল দুপুরে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালিত হয়েছে। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এহসানুল হক শিপনের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়।

অভিযানকালে ইফতার সামগ্রী, মিষ্টান্ন, মুদি ও ফলের দোকানে পণ্যের মান, মূল্যতালিকা, সামগ্রিক পরিবেশ এবং ক্রয় রসিদ যাচাই-বাছাই করা হয়। ক্রয় রসিদ প্রদর্শনে ব্যর্থ হওয়া ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণের দায়ে তিন ব্যবসায়ীকে সাত হাজার টাকা অর্থদণ্ড আরোপ ও আদায় করা হয়। এ সময় বাজারের ব্যবসায়ীদের সতর্ক করা হয় এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে পণ্য বিক্রির নির্দেশনা দেওয়া হয়।

হবিগঞ্জে বাজার তদারকি জোরদার করেছে জেলা প্রশাসন। গতকাল দুপুরে শহরের চৌধুরী বাজার পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন। এ সময় তিনি বিভিন্ন দোকানে গিয়ে নিত্যপণ্যের মূল্যতালিকা যাচাই করেন এবং বিক্রয়মূল্য পর্যবেক্ষণ করেন।

জেলা প্রশাসক বলেন, রমজানে সাধারণ মানুষের চাহিদা বৃদ্ধি পায়। তাই বাজারে দ্রব্যমূল্য যাতে ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে এবং কোনো ব্যবসায়ী অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রি করতে না পারে, সে লক্ষ্যে নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

নীলফামারীতে বাজার মনিটরিংয়ের অংশ হিসেবে শহরের বড়বাজারের বিভিন্ন দোকান পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান। গতকাল সকালে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে এ কার্যক্রম শুরু হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জ্যোতি বিকাশ চন্দ্র, জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শামসুল ইসলাম, জেলা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মাঠ ও বাজার পরিদর্শক এটিএম এরশাদ আলম খান প্রমুখ।

মনিটরিংকালে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, কৃত্রিম সংকট তৈরি না করাসহ রমজানে দ্রব্যমূল্যে স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে প্রশাসন তৎপর রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় জনসাধারণের কষ্ট লাঘবে বিশেষ ওই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

এছাড়াও চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে বিশেষ অভিযান চালিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। নানুপুর বাজারে গত বুধবার পরিচালিত এ অভিযানে ৯টি প্রতিষ্ঠানকে ২২ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। এভাবে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়, পিরোজপুরের কাউখালীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনের অভিযান পরিচালনার খবর পাওয়া গেছে।

বাজার মনিটরিং ব্যবস্থার পাশাপাশি ১০ লাখ পরিবারকে সুলভমূল্যে প্রোটিন খাদ্য, ফ্যামিলি কার্ড, ভ্রাম্যমাণ ট্রাকসেল ও ওএমএসের মাধ্যমে নিত্যপণ্য কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার।

গতকাল সকালে মহাখালীর প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সম্মেলনকক্ষে পবিত্র রমজানে সুলভমূল্যে দুধ, ডিম ও মাংস বিক্রয় কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, কৃষি এবং খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে জনগণের কল্যাণে কাজ করার প্রতিশ্রুতির ধারাবাহিকতায় পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সুলভমূল্যে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য (দুধ, ডিম, মাংস ও মাছ) সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কার্যক্রমের আওতায় সারা দেশে ১০ লক্ষাধিক পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সততা, নিষ্ঠা ও সমন্বিত টিমওয়ার্কের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এদিকে রমজান উপলক্ষে টিসিবির পাঁচ পণ্য বিক্রি শুরু হয়েছে। গত মঙ্গলবার থেকে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, ডাল ও খেজুর বিক্রি শুরু করেছে টিসিবি। এ কার্যক্রমের আওতায় সারা দেশে বাজারমূল্যের তুলনায় কমদামে পাওয়া যাবে এ পাঁচ পণ্য।

টিসিবির পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়, রোজার দুটি বাড়তি পণ্যÑছোলা প্রতি কেজি ৬০ টাকা ও খেজুর ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ভোজ্যতেল প্রতি লিটার ১১৫ টাকা, চিনি ৮০ টাকা ও মসুর ডাল ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ ট্রাক থেকে একজন ভোক্তা সর্বোচ্চ দুই লিটার তেল, এক কেজি চিনি, দুই কেজি ডাল, এক কেজি ছোলা ও বরাদ্দসাপেক্ষ এক-দুই কেজি খেজুর কিনতে পারছেন।

টিসিবির ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের পাশাপাশি ৭০ লাখ ফ্যামিলি কার্ডধারীদের জন্য নিয়মিত বিক্রি কার্যক্রম যথারীতি চলছে।

বর্তমানে নিত্যপণ্যের দাম গত রমজানের চেয়ে কিছুটা বাড়তি হলেও ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলের চেয়ে কম বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন বাজার ঘুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৪ সালের রোজার শুরুতে হাসিনা আমলে খুচরায় প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয় মানভেদে ৯০ থেকে ১১০ টাকায়। এবার সে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। তবে গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ৪০ থেকে ৫০ টাকায় পাওয়া গেছে। শুধু পেঁয়াজ নয়, এমনিভাবে গত হাসিনা আমলের তুলনায় এবার চিনি, মুরগির মাংস, ডিম ও তরিতরকারিসহ বেশকিছু ভোগ্যপণ্যের দাম কমেছে।

এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন আমার দেশকে বলেন, কঠোর নজরদারির পাশাপাশি নতুন সরকার যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে নিত্যপণ্যের দাম কমে আসবে বলে আশা করছি।

এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক আব্দুর রহিম খান বলেন, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ, ডালসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে দেশে। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে এবারের রমজানে এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নেই। তবে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে চাঁদাবাজি রোধ করতে কর্তৃপক্ষকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানান তিনি ।

এছাড়াও ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, রমজানের প্রথম কয়েকদিন ক্রেতার চাহিদা বেশি থাকলেও তিন-চারদিনের মধ্যে চাহিদা কিছুটা কমে আসবে। তাতে পণ্যের দামও কমবে বলে আশা করেন তারা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন