নীতিগত জটিলতায় ইলেকট্রনিকস শিল্পে বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা

সোহেল রহমান

নীতিগত জটিলতায় ইলেকট্রনিকস শিল্পে বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা

আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সাহসী বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির স্পর্শে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে হাঁটছিল বাংলাদেশের ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তিপণ্য উৎপাদন শিল্প। তবে সাম্প্রতিক কিছু শুল্কনীতি এবং নীতিগত অসামঞ্জস্যের কারণে সম্ভাবনাময় এই খাতের টেকসই বিকাশ এখন গভীর সংকটের মুখে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে উৎপাদিত যন্ত্রাংশ আমদানিতে রহস্যজনকভাবে শুল্ক ছাড় দিলেও উল্টো কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে উৎপাদনমুখী শিল্পের পরিবর্তে দেশে আবারও আমদানিনির্ভর শিল্প বিকাশের পথ সুগম হচ্ছে। এমন শুল্ক বিকৃতি ও সরকারি ক্রয়ে বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে এই খাত এখন এক কঠিন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, যা অব্যাহত থাকলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাহত হবে রপ্তানি বৃদ্ধির জাতীয় লক্ষ্যমাত্রাও।

বিজ্ঞাপন

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সাল নাগাদ দেশের ইলেকট্রনিকস ও আইসিটি পণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার ৯ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। প্রতি বছর গড়ে ১৫ শতাংশ হারে বাড়তে থাকা এই বাজার ২০৩০ সাল নাগাদ ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে দেশের রেফ্রিজারেটর চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ এবং এসি ও স্মার্টফোন বাজারের বড় অংশ স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর দখলে। শুধু তাই নয়, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারেও বাংলাদেশে তৈরি ইলেকট্রনিকস পণ্য রপ্তানি হচ্ছে, যা গত অর্থবছরে এক বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করেছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এনবিআরের জারি করা সংশোধিত প্রজ্ঞাপন (এসআরও নং-২৭৪) দেশীয় শিল্পের জন্য আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়িয়েছে। উক্ত প্রজ্ঞাপনে রেফ্রিজারেটর ও এসির এমন কিছু যন্ত্রাংশ (যেমন—ফ্যান ব্লোয়ার, কানেক্টিং পাইপ, শেলফ, স্টপার ব্লক) আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে, যা বহু বছর ধরে দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এসব যন্ত্রাংশ তৈরির কাঁচামাল আমদানিতে উদ্যোক্তাদের ১৫ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ শুল্ক দিতে হচ্ছে। ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের চেয়ে বিদেশ থেকে তৈরি পণ্য আনা এখন অনেক বেশি লাভজনক। এতে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশে সেমি-ফিনিশড গুডস (এসএফজি) প্রক্রিয়াকরণে বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া প্লাস্টিক শিল্প খাতে ছয় হাজার কারখানায় প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িয়ে আছে, যার বড় একটি অংশ ইলেকট্রনিকস খাতের ওপর নির্ভরশীল। শুল্ক বৈষম্যের কারণে এই বিশাল জনগোষ্ঠী এখন কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে। এটুআই ও আইএলও এর গবেষণা বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে প্রায় ৫৩ লাখ মানুষ চাকরি হারাতে পারে। বর্তমান শিল্পবিরোধী শুল্কনীতি এই সংকটকে আরো ঘনীভূত করবে।

ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম মাহবুবুল আলম বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কার্যালয়ে সম্প্রতি এক সংলাপে বলেছেন, সরকারি ক্রয়নীতিতেও দেশীয় পণ্য বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। পিপিআর ও পিডব্লিউডির তালিকায় বিদেশি ব্র্যান্ডকে ‘এ’ এবং দেশীয় ব্র্যান্ডকে ‘বি’ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করা সত্ত্বেও দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে সরকারি টেন্ডারে অংশ নিতে বাধার মুখে পড়ছে। এছাড়া সাফটা চুক্তির পূর্ণ সুবিধা না পাওয়ায় শ্রীলঙ্কাসহ প্রতিবেশী দেশগুলোতে রপ্তানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশি পণ্য অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে।

শুল্ক অসামঞ্জস্যতার উদাহরণ হিসেবে রেফ্রিজারেটরের গ্লাস শেলফের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, সেমি-ফিনিশড অবস্থায় এই পণ্য আনতে শুল্ক দিতে হয় না। অথচ একই পণ্য দেশে তৈরি করতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক দিতে হয় ৪৫ শতাংশ। এটি সরাসরি দেশীয় উৎপাদনকে নিরুৎসাহিত করছে। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশ আবারও আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে।

ইলেকট্রোমার্ট লিমিটেডের (কনকা/গ্রি/হাইকো) উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল আফসার আমার দেশকে বলেন, এ খাতের বিকাশে অন্যতম অন্তরায় হলো—প্রতি বছর নীতির পরিবর্তন। ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ভ্যাট ১৫ শতাংশ হলেও দেশীয় শিল্পের বিকাশে এই হার যৌক্তিকীকরণ করা আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে উদ্যোক্তাদের অন্যতম দাবি।

আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এ শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় বেশকিছু বৈপ্লবিক পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা জানান, দেশেই উৎপাদিত হয় এমন যন্ত্রাংশ আমদানিতে পুনরায় নিয়ন্ত্রণমূলক সম্পূরক শুল্ক আরোপ এবং কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা। আমদানিকারক, সংযোজনকারী ও প্রকৃত উৎপাদনকারীদের মধ্যে শুল্ক হারের কার্যকর পার্থক্য তৈরি করা। স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজন বাড়াতে অন্তত ২০৩২ সাল পর্যন্ত কর অবকাশ সুবিধা নিশ্চিত করা। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যকে সরকারি কেনাকাটায় অগ্রাধিকার দিয়ে ক্যাটাগরি বৈষম্য দূর করা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ পেতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি সুবিধা বজায় রাখতে হলে পণ্যে অন্তত ৪০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজন নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বর্তমানের আমদানিবান্ধব নীতি অব্যাহত থাকলে দেশ আবারও পরনির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করবে। তাই টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন বাস্তবায়নে দেশীয় হাই-টেক শিল্পের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।-বিজ্ঞপ্তি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন