সংকটময় ব্যাংকিং খাত, তবু নতুন ব্যাংকের আবেদন

সংকটময় ব্যাংকিং খাত, তবু নতুন ব্যাংকের আবেদন

দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত যখন খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, তারল্য সংকট এবং আস্থার ঘাটতি মোকাবিলা করে টিকে থাকার লড়াই করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে পিপিপি বা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব মডেলে নতুন একটি তফসিলি ব্যাংক স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন একদল উদ্যোক্তা। আট বছর ধরে এই আবেদন ঝুলে থাকার পর উদ্যোক্তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এর দ্রুত নিষ্পত্তি ও লাইসেন্সের দাবি জানিয়েছেন তারা। তবে বর্তমান আর্থিক খাতের নাজুক পরিস্থিতির মুখে এই নতুন ব্যাংকের আবেদন কতটা বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অর্থনীতিবিদরা।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বর্তমান আর্থিক খাত তীব্র চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক খাতের সুশাসন ফিরিয়ে আনতে এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সবল ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার বা ‘মার্জার’-এর নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এত অধিকসংখ্যক ব্যাংকের ভিড়ে অনেক ব্যাংকই যখন ঠিকমতো মূলধন সংরক্ষণ ও তারল্য ব্যবস্থাপনা করতে পারছে না, তখন নতুন ব্যাংক বাজারে আনা কতটা সুফল বয়ে আনবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ আমার দেশকে বলেন, দেশে নতুন করে ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, কারো দরকার হলে পুরোনো ব্যাংক কিনে নিতে পারেন।

বর্তমান ব্যাংকিং খাতের বাস্তবতায় নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শহিদুল ইসলাম জাহীদ আমার দেশকে বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান দুরবস্থার কারণে যখন মানুষ খাতটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন, ঠিক সেই সময়ে নতুন কোনো ব্যাংক অনুমোদন দেওয়ার পেছনে কোনো অর্থনৈতিক নেই।

তিনি বলেন, অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় যত্রতত্র ব্যাংক অনুমোদন দেওয়ার ফলেই আজকের এই ভঙ্গুর ও করুণ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। অতীতে রাজনৈতিক প্রভাবে অনুমোদন পাওয়া ব্যাংকগুলো আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় পুরো খাতটি সংকটের মুখে পড়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ও গণতান্ত্রিক সরকার সেই পুরোনো ভুল পথে হাঁটবে না এবং ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে নতুন ব্যাংক অনুমোদনের ব্যাপারে চরম সতর্ক ও বাস্তবসম্মত অবস্থান নেবে বলেই তিনি আশা প্রকাশ করেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘এএফসি ব্যাংক লিমিটেড’ নামক একটি বিশেষায়িত তফসিলি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়েছেন একজন উদ্যোক্তা হুমায়ুন কবীর পাটওয়ারী। তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, দেশের প্রান্তিক ও সাধারণ মানুষের কাছে প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ‘এএফসি ব্যাংক লিমিটেড’ নামক একটি বিশেষায়িত তফসিলি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। নতুন এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পক্ষে তিনি যুক্তি তুলে ধরেছেন, প্রচলিত ব্যাংকগুলোর সেবা এখনো দেশের বৃহৎ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে পৌঁছাতে পারেনি। প্রস্তাবিত ব্যাংকটি গঠিত হলে তা গতানুগতিক বড় ব্যবসায়ীদের গণ্ডির বাইরে গিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক কৃষি ঋণ ও ব্যাংকিং সেবার সুযোগ সৃষ্টি করা, গবাদিপশু পালন, পোলট্রি, মৎস্য খামার এবং কুটির শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের জন্য মূলধন জোগাড়ের সুযোগ তৈরি করা। পাশাপাশি প্রবাসফেরত কর্মীদের সঞ্চিত অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ এবং বেকার যুবকদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনয়ন এবং সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করার বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

চিঠিতে তিনি অভিযোগ করে বলেন, বিগত ২০১৬ সালের ২২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য নির্দেশ পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে এ সংক্রান্ত আবেদন ও কাগজপত্র দাখিল করা হলেও দীর্ঘসূত্রতার বেড়াজালে তা কেবল ফাইল চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। অথচ দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপিরা খুব সহজেই আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে গেলেও সাধারণ মানুষের কল্যাণমূলক এই প্রস্তাবিত ব্যাংকটির ফাইল বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়েছে, যা কেবল আমলাতান্ত্রিক লালফিতার দৌরাত্ম্যেরই স্পষ্ট প্রমাণ। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সরকারের দক্ষতার ওপর সরাসরি প্রশ্ন তুলেছে এই দীর্ঘসূত্রতা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন