সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জনপ্রশাসন, ঋণের সুদ পরিশোধ, শিক্ষা, ভর্তুকি ও প্রণোদনা এবং স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই পাঁচ খাতে মোট বাজেটের ৫৮ শতাংশ ব্যয় হবে।
বাজেট সংক্ষিপ্ত সারের পরিচালন ও উন্নয়ন তথ্য অনুযায়ী, সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে জনপ্রশাসন খাতে। এ খাতে এক লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা মোট বাজেটের ১৫ দশমিক এক শতাংশ। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ৮৬ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে সুদ ব্যয় খাতে। দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধে আগামী অর্থবছরে এক লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ১৩ দশমিক ছয় শতাংশ। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে সুদ ব্যয় ধরা হয়েছিল এক লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা করা হয়।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে ব্যাপক হারে ঋণ নেওয়ার ফলে ঋণ ও সুদ পরিশোধ ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে শিক্ষা খাতে। প্রতি বছর শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কম রাখা হলেও বিএনপি সরকার নির্বাচনের আগে এ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই অনুযায়ী এ খাতে এক লাখ ২২ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ১৩ দশমিক এক শতাংশ। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে যা ছিল ৮৫ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা।
যদিও বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু শিক্ষা খাতে এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছেন। শিক্ষা খাতে এ বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) দুই শতাংশ। নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির পাঁচ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণের কথাও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
শিক্ষা খাতে বরাদ্দের গুরুত্বারোপ করে অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ‘এবারের বাজেটে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে আমরা জাতীয় অগ্রযাত্রার নিউক্লিয়াস (মূল কেন্দ্র) হিসেবে বিবেচনা করেছি। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষমতার দ্বারা। তাই বর্তমান সরকার শিক্ষাকে কেবল সনদ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়; বরং জাতীয় পুনর্গঠন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা এবং কর্মসংস্থানমুখী অর্থনীতির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে।’
চতুর্থ সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয় ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে। এ খাতে মোট ৮৯ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৯৫ হাজার ৫৫ কোটি টাকা। এরপরই স্বাস্থ্য খাতে ৬২ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ছয় দশমিক সাত শতাংশ। সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ২৮ হাজার ৫৫ কোটি টাকা।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠন টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের পূর্বশর্ত। তবে ফ্যাসিবাদী সময়ে স্বাস্থ্য খাতে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ও উপকরণ ক্রয়ে বিপুল ব্যয় হলেও সেবার মানে প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি।
এছাড়া পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে মোট বাজেটের ছয় দশমিক ছয় শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে পাঁচ দশমিক আট শতাংশ, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন চার দশমিক ছয় শতাংশ, প্রতিরক্ষা খাতে তিন দশমিক আট শতাংশ, পেনশন বাবদ তিন দশমিক আট শতাংশ, জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে তিন দশমিক পাঁচ শতাংশ, কৃষি খাতে তিন দশমিক দুই শতাংশ, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দুই দশমিক এক শতাংশ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে এক দশমিক আট শতাংশ, বিনোদন, সংস্কৃতি ও ধর্ম শূন্য দশমিক আট শতাংশ, গৃহায়নে শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ, শিল্প ও অর্থনৈতিক সার্ভিস শূন্য দশমিক চার শতাংশ এবং বিবিধ ব্যয় পাঁচ দশমিক এক শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এবারের প্রস্তাবিত বাজেট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়াচ্ছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। বাজেটের বিশাল এই ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক—দুই উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে।
এএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

