দেশে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবায় ঋণ বিতরণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। গত এক বছরে এ খাতে প্রায় ৪৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একই সময়ে আমানত বেড়েছে প্রায় সাড়ে ১৮ শতাংশ। এছাড়া এ সেবা ব্যবহার করে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সেও বড় প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। সহজ প্রক্রিয়ায় ঋণ গ্রহণ, সঞ্চয়ের সুবিধা, তুলনামূলক কম সুদহার এসব কারণে এ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের এজেন্ট ব্যাংকিং কেন্দ্র থেকে ঋণ নিতে গ্রাহকদের বাড়ি থেকে দূরে ব্যাংকের শাখায় যেতে হয় না। হাতের নাগালে এখান থেকে সব সেবা পাওয়া যাচ্ছে। তাই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ঋণ বিতরণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এজেন্ট ব্যাংকিং হলো শাখা না খুলে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সেবা দেওয়ার একটি ব্যবস্থা। ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনাসংক্রান্ত নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতিমালায় প্রথমে শুধু পল্লি এলাকায় এজেন্ট ব্যাংকিং করার সুযোগ দেওয়া হলেও পরের বছর নীতিমালা কিছুটা সংশোধন করে পৌর ও শহরাঞ্চলেও এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর সুযোগ দেওয়া হয়। এ পর্যন্ত ৩১টি ব্যাংককে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যার সবগুলোই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাসাবাড়ির নিচে বা বাসাবাড়ি থেকে একটু দূরে স্থানীয় হাঁটবাজারে এজেন্ট আউটলেট বা বুথেই ব্যাংকের মতো প্রায় সব ধরনের সেবা পাওয়া যাচ্ছে। এজেন্ট আউটলেটে একজন গ্রাহক সহজেই তার বায়োমেট্রিক বা হাতের আঙুলের স্পর্শের মাধ্যমে হিসাব পরিচালনা করতে পারেন। অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা থেকে শুরু করে আমানতের টাকা জমা ও উত্তোলন, মোবাইল রিচার্জ, টাকা স্থানান্তর (দেশের ভেতর), রেমিট্যান্সের অর্থ উত্তোলন, ইউটিলিটি বিল এবং যানবাহনের লাইসেন্স ও ফিটনেস ফি গ্রহণ, বিভিন্ন ধরনের ঋণ বিতরণ ও আদায় এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সব ধরনের ভাতা এ সেবার মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এ সেবায় বাড়তি কোনো চার্জও নেই। এছাড়া ডেবিট কার্ড, চেকবই ও ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের সুবিধাও নিতে পারেন এজেন্ট ব্যংকিংয়ের গ্রাহকরা। ফলে এ সেবার জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রতি ত্রৈমাসিকে এজেন্ট ব্যাংকিং নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতায় গ্রাহকদের অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ৫৮ লাখ ৩২ হাজার ৯৮১টি, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল দুই কোটি ৪০ লাখ ৭৮ হাজার ২৩০টি। ফলে গত এক বছরে এ সেবার আওতায় গ্রাহক বেড়েছে ১৭ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫১ জন। অন্যদিকে এজেন্ট ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টধারীর মধ্যে নারী গ্রাহকের সংখ্যা এখন এক কোটি ২৮ লাখ সাত হাজার ৩৩১ জন।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪ সাল শেষে এজেন্ট ব্যাংকিয়ে আমানতের পরিমাণ ছিল ৪১ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সাল শেষে দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। ফলে গত এক বছরে এজেন্ট ব্যাংকিয়ে আমানত বেড়েছে প্রায় সাত হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা বা ১৮ দশমিক ৫১ শতাংশ।
অন্যদিকে ২০২৫ সাল শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতায় ঋণ বিতরণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ২৩ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল ২৪ হাজার ২৮ কোটি টাকা। ফলে গত এক বছরে এ সেবায় ঋণ বিতরণ বেড়েছে ১০ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা বা ৪৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণে শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। এজেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে মোট বিতরণ করা ঋণের মধ্যে ৭২ দশমিক ১২ শতাংশ বিতরণ করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সিটি ব্যাংক ১১ শতাংশ। এছাড়া ব্যাংক এশিয়া ৫ শতাংশ, ইসলামী ব্যাংক সাড়ে ৪ শতাংশ এবং ডাচ্-বাংলা ৩ দশমিক ২৭ শতাংশ ঋণ বিতরণ করেছে।
শুধু আমানত ও ঋণ বিতরণই নয়, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতায় প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বিতরণেও বড় প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। প্রতিবেদন বলছে, গত বছরে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আওতায় রেমিট্যান্স বিতরণ বেড়েছে প্রায় ২৬ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা বা ১৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
তবে গত এক বছরে এজেন্ট সংখ্যা কমে গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সাল শেষে এজেন্ট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৩২৭ জন। ২০২৪ সাল শেষে ছিল ১৬ হাজার ২১জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এজেন্টের সংখ্যা কমেছে ৬৯৪টি। বর্তমানে মোট এজেন্টের মধ্যে প্রায় ৮৪ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে। এজেন্টের সংখ্যা কমার পাশাপাশি আউটলেটে বড় প্রভাব পড়েছে। গত বছর আউটলেট কমেছে ৭৪৭টি। মোট এজেন্ট আউটলেটের প্রায় ৮৫ শতাংশ গ্রামে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

