দেশের বিদেশি ঋণ আরো বেড়েছে। গত বছরের শেষ তিন মাসে ঋণ ১৩০ কোটি ডলার বা ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন বেড়ে স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১১৩ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলারে, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ। গত বছরের সেপ্টেম্বরের শেষে ছিল ১১২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় ঋণ ছিল ১০৩ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে ঋণ বেড়েছিল ১০ বিলিয়ন ডলার।
গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের ওপর বিদেশি ঋণের চাপ বাড়ছে। আওয়ামী লীগ সরকার বিদেশি ঋণ নিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিমানবন্দরের টার্মিনাল, নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েসহ বড় বড় প্রকল্প করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন ঋণদাতা সংস্থা থেকে ঋণ নিয়েছে। মূলত সরকার ক্ষমতায় আসার প্রথম বছরেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য বিদেশ থেকে প্রায় চার বিলিয়ন ডলার ঋণ নিয়েছিল। সব মিলিয়ে বিদেশি ঋণ বেড়েছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে ২০২২ সাল থেকে বাংলাদেশে ডলারের দাম বাড়তে শুরু করে। তাতে ডলারের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বড় ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে প্রতি ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছায়। এতে দেশের অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তোলে। এ সংকট সামাল দিতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বিদেশি ঋণ বাড়ানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তারপরও বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পতন থামানো যায়নি। তবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রিজার্ভের পতন থামাতে সক্ষম হয়েছিল। ডলারের বিনিময়হারেও এসেছিল স্থিতিশীলতা। প্রবাসী আয়ে জোরালো প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক উৎস থেকে কাঙ্ক্ষিত ঋণ পাওয়াই এর অন্যতম কারণ বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
গত বছরের শেষ তিন মাস অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে সরকারি ও বেসরকারি দুই খাতেই বিদেশি ঋণ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি খাতের ঋণ স্থিতি ছিল ৯২ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার। ডিসেম্বরে তা বেড়ে ৯৩ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার হয়। তিন মাসে এ খাতে ঋণ বেড়েছে ৯০ কোটি ডলার।
অন্যদিকে ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ স্থিতি বেড়ে হয়েছে ২০ দশমিক শূন্য ৫ বিলিয়ন ডলার। সেপ্টেম্বর শেষে ছিল ১৯ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিদেশি ঋণের মধ্যে সরকারের ঋণই বেশি। বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদেশি ঋণ দরকার আছে। তবে উদ্বেগের জায়গা হলো, আগে বিদেশি ঋণ নিয়ে অপচয় হয়েছে। সেগুলো যদি বন্ধ না হয়, তাহলে ঋণ বৃথা হয়ে যায়। আর যদি ঋণ নিয়ে ঠিকমতো ব্যবহার করা যায়, তাহলে পরিশোধ করার সক্ষমতা তৈরি হবে।
ড. জাহিদ আরো বলেন, জিডিপি অনুপাতে বিদেশি ঋণ এখনো সহনীয় মাত্রায় আছে। যদিও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের তুলনায় বৈদেশিক ঋণের সুদাসল পরিশোধের অঙ্কটা অনেক বেড়ে গেছে। ফলে সার্বিকভাবে স্বস্তিদায়ক মনে হলেও পরিশোধ করতে গিয়ে ঠিকই ঘাম বেরিয়ে যাবে।
বিগত কয়েক বছর ধরে অর্থনীতিবিদরাও বিদেশি ঋণ গ্রহণের বিষয়ে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছিলেন। তবে তাদের পরামর্শ উপেক্ষা করেই শেখ হাসিনার সরকার বিদেশি উৎস থেকে ঋণ বাড়িয়েছিল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

