ভোজ্যতেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব

সরদার আনিছ

ভোজ্যতেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব

জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটের মধ্যেই বাজারে ভোজ্যতেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে বলে জানিয়েছেন খুচরা বিক্রেতারা। তারা বলছেন, কোম্পানিগুলো বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ ব্যাপকহারে কমিয়ে দেওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

গত বুধবার কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ানোর কথা তুলে ধরে ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয়ের দাবি জানান। ওইদিন ভোজ্যতেল পরিশোধন ও উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ট্যারিফ কমিশনে চিঠি দেয় । তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো বৈঠক কিংবা সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার।

বিজ্ঞাপন

গতকাল রোববার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ও মফস্বল এলাকায় খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, বোতলজাত সয়াবিন তেলের এ সরবরাহ সংকট চলছে মাস দেড়েকের বেশি সময় ধরে। কোম্পানিগুলো চাহিদার তুলনায় কম পরিমাণে বোতলজাত সয়াবিন তেল বাজারে সরবরাহ করছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলে লাভের পরিমাণ কমে যাওয়ায় তারা সরবরাহে অনাগ্রহী। ফলে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম বলে জানিয়েছেন খুচরা বিক্রেতারা।

গতকাল রাজধানীর নয়াবাজারে গিয়ে অধিকাংশ দোকানে এক-দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল কম লক্ষ করা গেছে। দোকানে পাঁচ লিটারের বোতল পাওয়া গেলেও সংখ্যায় খুব কম। কারওয়ান বাজারের দোকানগুলোতেও বোতলজাত সয়াবিন কম দেখা গেছে।

এ বিষয়ে মায়ের দোয়া স্টোরের বিক্রেতা ইমাম উদ্দিন বাবলু বলেন, সংকট আরো বাড়তে পারে। ২০ রমজানের পর যুদ্ধের কথা বলে অনেক পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছিল; এখন জ্বালানি তেলের সংকটের কথা বলে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। এরই মধ্যে আমদানিনির্ভর মসলাসহ অনেক পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, ভোজ্যতেলের বিষয়ে কোম্পানিগুলো লুকোচুরি খেলছে। সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছতে না পেরে তারা দেড় মাস ধরে বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন কমিয়ে দিয়ে কৌশলে দাম বাড়ানো হয়েছে।

নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করে এ ব্যবসায়ী বলেন, জ্বালানি তেলের সংকটে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে অনেক নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। এ আশঙ্কায় অনেকে মজুত থাকলেও বিক্রি কম করছেন। অন্য পণ্য না নিলে কারো কাছে শুধু সয়াবিন তেলের বোতল বিক্রি করছেন না। তিনি আরো বলেন, আগে এক-দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি করলে পাঁচ থেকে সাত টাকা এবং পাঁচ লিটারের বোতলে ২০ টাকা কমিশন দেওয়া হতো; এখন এক থেকে পাঁচ টাকা দেওয়া হয়। অর্থাৎ দাম না বাড়লেও খুচরা বিক্রেতাদের লাভ কমে যাওয়ায় সয়াবিন তেল বিক্রিতে আগ্রহ কমে গেছে।

কেরানীগঞ্জ মডেল টাউনের দোকানি আব্দুর রশিদ বলেন, এক-দুই লিটারের বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি করে এখন কোনো লাভ হয় না। সরবরাহও পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেকে বাড়তি দামেও বিক্রি করছেন।

কেরানীগঞ্জ বউবাজারের দোকানি নাফিস বলেন, দীর্ঘ দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট চলছে। ঈদের পর এ সংকট আরো তীব্র হয়েছে। বাজারের অধিকাংশ দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে কোথাও কোথাও বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। এ সংকট কাটাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সর্বশেষ গত বছরের ৮ ডিসেম্বর বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ছয় টাকা বাড়ানো হয়। ওই সময় এক লিটার বোতলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১৯৫ টাকা, দুই লিটার ৩৯০ টাকা এবং পাঁচ লিটার বোতলের দাম ৯৫৫ টাকা দাম নির্ধারণ করা হয়। এরপর কোম্পানি পর্যায়ে আর দাম না বাড়লেও পরিবেশক পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়েছে। গত দেড় মাসে পরিবেশক পর্যায়ে দাম বাড়ায় খুচরা পর্যায়েও বাড়তি দামে তেল কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।

দোকানিরা বলছেন, পাঁচ লিটারের এক বোতল সয়াবিনের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৯৫৫ টাকা। দোকানদাররা এ তেল ৯৪৫ টাকায় পরিবেশকের কাছ থেকে কেনেন এবং ৯৫০-৯৫৫ টাকায় ভোক্তার কাছে বিক্রি করেন। মাস দেড়েক আগে পাঁচ লিটারের বোতল ৯৩৫ টাকায় কিনে ভোক্তার কাছে ৯৪০-৯৪৫ টাকায় বিক্রি করতেন। এখন ভোক্তা পর্যায়ে সয়াবিনের দাম ১০ টাকা করে বেড়েছে। দাম এমআরপির মধ্যে থাকলেও ভোক্তাকে আগের চেয়ে বেশি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। রাজধানী ঢাকার কোথাও কোথাও এমআরপির চেয়ে বেশি দামেও বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকটের মধ্যে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দামও কিছুটা বেড়েছে। পাইকারি বাজারে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম কেজিতে পাঁচ টাকার মতো বেড়েছে।

গতকাল রোববার কারওয়ান বাজারে পাইকারিতে প্রতি কেজি খোলা সয়াবিন তেল ১৯৮ থেকে ২০০ টাকা এবং খোলা পাম তেল ১৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে ।

কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন। তিনি আমার দেশকে বলেন, সরকারি নজরদারির অভাবেও অসাধু ব্যবসায়ীরা ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে। সিন্ডিকেট, মজুতদারি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে সব সময় নিত্যপণ্যের দাম বাড়ে। কোম্পানিগুলো রমজানের আগেই ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে আসছিল, কিন্তু তখন দাম বাড়াতে না পেরে সরবরাহ ও কমিশন কমিয়ে দিয়ে বাজারে একধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। এতে কোম্পানিগুলো কৌশলে ভোজ্যতেলের দাম বাড়াতে সরকারকে বাধ্য করতে চাচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন