ইরান যুদ্ধে বিপর্যস্ত ভারতীয় অর্থনীতি

বাণিজ্য ডেস্ক

ইরান যুদ্ধে বিপর্যস্ত ভারতীয় অর্থনীতি
ছবি: এআই

ইরান যুদ্ধের ফলে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে বলে সরকারকে সতর্কবার্তা দিয়েছে ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স। সংস্থাটি বলছে, সম্প্রতি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিমান চলাচল বন্ধ এবং ফ্লাইট বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জেট ফুয়েলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশের প্রধান বিমান সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়া গ্রুপ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় রুটেই তাদের জ্বালানি মাশুল সংশোধন করেছে। খবর ডব্লিউপিআরের।

মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি প্রবাহ ব্যাহত, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতির বিভিন্ন খাত—এয়ারলাইন্স, ওষুধ শিল্প, গৃহস্থালির রান্নার গ্যাস ছাড়াও খাদ্যদ্রব্যের দামে পর্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এই ধাক্কা মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং রুপির মান দুর্বল হচ্ছে, যা ভারতের প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একইসঙ্গে এটি জ্বালানি নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনাও বাড়িয়ে তুলেছে।

বিজ্ঞাপন

সবচেয়ে জরুরি চাপের জায়গাটি হলো জেট ফুয়েল, যার দাম ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বর্তমানে ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয়ের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশই এর পেছনে খরচ হয়।

বিমান সংস্থাগুলো মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা ব্যবহারের বিধিনিষেধ নিয়েও সংকটে পড়েছে, যা যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোর। ইরানের আকাশসীমা এড়াতে ফ্লাইটগুলোকে দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল পথে ঘুরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে জ্বালানি খরচ ও পরিচালনগত চাপ বাড়ছে। খাতটির ওপর এই বাড়তি চাপ দুই দেশের মধ্যে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর গত মে মাস থেকে ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলোর জন্য পাকিস্তানের আকাশসীমা বন্ধ করে দেওয়ার কারণে সৃষ্ট পূর্ববর্তী সমস্যাগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

এছাড়া বিশ্বের জেনেরিক ওষুধের সরবরাহের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ভারতীয় ওষুধ শিল্প জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ পথগুলো বিঘ্নিত হওয়ায় ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়েছে।

দেশটি বিশ্বের মোট জেনেরিক ওষুধের প্রায় ২০ শতাংশ উৎপাদন করে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত ওষুধের প্রায় অর্ধেকই ভারতের। দেশটির এই উৎপাদন ব্যবস্থা আমদানি করা কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ আসে চীন থেকে। তেলের ক্রমবর্ধমান দাম এখন এই কাঁচামালগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রাবক, পরিবহন ও প্যাকেজিংয়ের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে লজিস্টিক বিভ্রাট এবং উচ্চ বীমা খরচের ফলে পণ্য পরিবহন ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে এবং ওষুধ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল সরবরাহে দেরি হচ্ছে। অবশ্য কোম্পানিগুলোর কাছে এখনো কিছু কাঁচামাল মজুত আছে। তবে কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, এই অচলাবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে কয়েক মাসের মধ্যেই সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে।

আমদানি করা জ্বালানির ওপর ভারতের অত্যধিক নির্ভরশীলতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা হলে দেশটির ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।

বিশ্বের মোট জ্বালানির ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। আর ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং গ্যাসের ৮০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে প্রণালিটি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভারতের সংকট গভীর আকার ধারণ করে।

অপরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিকল্প সরবরাহকারী দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থাকলেও, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বিষয়টি গভীর উদ্বেগের কারণ। দেশটির মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা গ্যাসের বড় অংশ আসে কাতার থেকে। বর্তমানে যুদ্ধজনিত ক্ষয়ক্ষতির কারণে কাতারের সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে।

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। দেশটির এলপিজি সরবরাহের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই আমদানি করতে হয়, যার ৯০ শতাংশ পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে আসে। মার্চ মাসে ভারত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এলপিজি সংকটের সম্মুখীন হয়, যা সরকারকে বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীদের বাদ দিয়ে শুধু পরিবারগুলোতে সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাধ্য করে।

জ্বালানির ক্রমবর্ধমান দাম মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দিচ্ছে, যা পরিবহন ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। নয়া দিল্লির ঠিক বাইরে অবস্থিত এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম শিল্প শহর নয়ডাতে এই মাসের শুরুতে বিক্ষোভ শুরু হয়, যেখানে শ্রমিকরা ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে উচ্চ মজুরির দাবি জানান।

প্রবাসী ভারতীয়দের পাঠানো রেমিট্যান্সও এখন ঝুঁকির মুখে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তারা বার্ষিক ৫০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ দেশে পাঠান। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে শ্রমিক, ছাত্র এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীসহ প্রায় ১০ লাখ ভারতীয় নাগরিক দেশে ফিরে এসেছেন, যা আয় হ্রাস এবং অভ্যন্তরীণ বেকারত্বের চাপের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকার বিদেশি শ্রমিকদের জন্য প্রত্যাবাসন ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা ছাড়া কার্যকর তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বর্তমান যুদ্ধের পরিস্থিতিতে ১৪টি দেশে প্রায় ৮৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কবলে পড়তে পারে, যার মধ্যে কেবল ভারতেই ২৫ লাখের বেশি। প্রতিবেদনে জ্বালানি সংকট এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের কারণে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটি বিস্তৃত মানব উন্নয়ন সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

রাজনৈতিক প্রভাব ইতোমধ্যেই উচ্চপর্যায়ে অনুভূত হতে শুরু করেছে। ভারতের বিরোধীদলীয় নেতারা এই পরিস্থিতিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পররাষ্ট্রনীতির ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েকদিন আগে তার ইসরায়েল সফরকে তারা এই অঞ্চলে ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ভারসাম্য—বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিচ্যুতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

নয়াদিল্লি এরপর থেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎপর হয়েছে এবং কূটনৈতিক তৎপরতা ও ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের মাধ্যমে আলোচনার পথগুলো নীরবে পুনর্গঠন করছে। ভারতীয় জনগণের মধ্যে, বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরে ইরানের প্রতি সংহতি প্রকাশের বিষয়টি এই প্রচেষ্টায় সহায়ক হয়েছে। একই সময়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের উত্থান বিরোধী দলগুলোর আক্রমণকে আরো জোরালো করেছে এবং প্রতিবেশে উদ্ভূত এই সংকট নিরসনে মোদি সরকারের প্রভাবের সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করেছে।

এমনকি যখন ভারতের পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো ক্রমেই অর্থনৈতিক চাপের সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে, তখনো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রভাব এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে বলেই মনে হচ্ছে। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ এবং আসামে শেষ হওয়া বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির শক্তিশালী অবস্থান তারই প্রমাণ। তবে যুদ্ধ যদি চলতেই থাকে, মোদি সরকার আরো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন