২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বেশকিছু ইতিবাচক উদ্যোগ রয়েছে। তবে এর সফল বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ (আইবিএফবি)।
বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আইবিএফবি আয়োজিত ‘প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এ কথা বলেন। এতে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সভাপতি লুৎফুন্নিসা সাউদিয়া খান, সাবেক সভাপতি হুমায়ুন রশীদ, পরিচালক এম এস সিদ্দিকী, সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ প্রমুখ।
লিখিত বক্তব্যে লুৎফুন্নিসা বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ৮৭ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য খাতে প্রায় দ্বিগুণ করে ৬৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি জনসেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের ইঙ্গিত বহন করে। এছাড়া আগামী পাঁচ বছরের ব্যক্তিশ্রেণির কর কাঠামো একসঙ্গে ঘোষণা, বৈদ্যুতিক যানবাহনে দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক রেয়াত এবং ক্রিয়েটিভ ও স্পোর্টস ইকোনমিকে অর্থনীতির মূলধারায় আনার উদ্যোগ দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তিনি বলেন, বাজেটে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, এসএমই উন্নয়ন, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা, ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কর ছাড়ের উদ্যোগ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে।তবে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, মূল্যস্ফীতির চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এ সময় আইবিএফবির পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়। লুৎফুন্নিসা বলেন, কর প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার, ব্যবসা সহজীকরণ, এসএমই অর্থায়ন সম্প্রসারণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত, কার্যকর বাস্তবায়ন, সুশাসন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে। এটা করতে পারলে এ বাজেট দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তিকে আরো শক্তিশালী করবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে ড. আব্দুল মজিদ বলেন, টেকসই বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন অর্থবছরের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বাজেট বাড়লেও তা সুফল আনবে কি না তা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।
নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের উপর বাজেট বেশি চাপ ফেলবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাজেট যেসব সুযোগ সুবিধার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো আদৌ কার্যকর বাস্তবায়ন করা যাবে কি না, তার উপর নির্ভর করবে। যেমন আমি শিক্ষায় বাজেট বাড়িয়ে দিলাম, কিন্তু স্কিল ম্যানপাওয়ার আসার কথা, জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ আসার কথাÑসেগুলো আসছে না। দেখা যায় এই টাকা দিয়ে সুন্দর সুন্দর বিল্ডিং বানানো হয়েছে, আগেও এটা করা হয়েছে। কিন্তু ওই বিল্ডিংগুলোর ভেতরে প্রাণ নেই।
তিনি আরো বলেন, আগে কুঁড়েঘরের শিক্ষক যা পড়াতেন, আর সুন্দর বিল্ডিংয়ের ভেতরে শিক্ষক যা পড়াচ্ছেন—তার মধ্যে যদি পার্থক্য করা না যায়, তাহলে বাজেট বাড়িয়ে লাভ হবে না। স্বাস্থ্যখাতেও একই কথা; সেবা না বাড়িয়ে দালান বাড়ালে সাধারণ মানুষের জীবনে এই বাজেটের কোনো প্রভাব পড়বে না।
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আব্দুল মজিদ বলেন, বাজেটে নির্ধারিত রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারবে না। অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে বোঝা যাচ্ছে এইটা অর্জিত হবে না। গত ১৫ বছর একটা ছন্নছাড়া অর্থনীতি ছিল। পুঁজিবাজার, ব্যাংক খাত শেষ হয়ে গেছে। যেসব জায়গা থেকে রেভিনিউ আসে, সেইগুলোই শেষ হয়ে আছে।
নতুন অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। এতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বর্তমান বাস্তবতায় অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। একইসঙ্গে সরকারি ঋণের ওপর অতিনির্ভরতা, ঋণের সুদ পরিশোধের বাড়তি চাপ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খেলাপি ঋণ এবং প্রশাসনিক সক্ষমতার ঘাটতি অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তারা বলেন, বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো সুশাসন। সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, ই-জিপি সম্প্রসারণ, প্রকল্প মূল্যায়ন এবং ফলাফলভিত্তিক বাজেটিং নিশ্চিত করা গেলে প্রস্তাবিত বাজেটের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

