স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তন ঘটেছে। তবে অর্থনীতির এই কাঠামোগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি সরকারের রাজস্ব আহরণ। অর্থনীতির আকার বাড়লেও কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৬ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যা রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও করজালের সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
‘অর্থনীতির পথ পরিক্রমা’য় অর্থনীতিতে কৃষি খাতের বড় বিপর্যয়ের চিত্র উঠে এসেছে। হিসাব অনুযায়ী, স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে জিডিপিতে একক খাত হিসেবে কৃষির অবদান ৪৯.৮ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে ১২ শতাংশের কাছাকাছি। সে হিসাবে পাঁচ দশকে জিডিপিতে কৃষির অবদান ৭৪ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। তবে একই সময়ে শিল্পখাতের অবদান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৪ শতাংশে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের ‘বাংলাদেশের ব্যাল্যান্স শিট (১৯৭২-২০২৫) : পাঁচ দশকে অর্থনীতির পথ পরিক্রমা’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেন সাবেক সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আব্দুল মজিদ।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ছিল ৪৯.৮ শতাংশ। ১৯৮০ সালে তা কমে ৪৪.২ শতাংশে, ২০০০ সালে ২৪.১ শতাংশে এবং ২০২০ সালে ১২.৮ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালের প্রক্ষেপণে কৃষির অবদান দেখানো হয়েছে ১১.৪২ শতাংশ।
একই সময়ে বেড়েছে শিল্প খাতের অবদান । ১৯৭২ সালে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ছিল ৯ শতাংশ। ২০০০ সালে তা বেড়ে ২৫.২ শতাংশে এবং ২০২৫ সালে ৩৪.০৩ শতাংশে পৌঁছেছে। উৎপাদন শিল্পের অবদানও বেড়েছে। ১৯৭২ সালে উৎপাদন শিল্পের অবদান ছিল ৩.১ শতাংশ, ২০২১ সালে তা ২১.৮৯ শতাংশে দাঁড়ায় এবং ২০২৫ সালের প্রক্ষেপণে ৩৭.৬৫ শতাংশ দেখানো হয়েছে।
এশিয়াটিক সোসাইটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, কৃষির জিডিপি অংশ কমে এলেও খাতটির গুরুত্ব কমেনি। দেশের মোট ভূমির বড় অংশ কৃষি কাজে ব্যবহৃত হয় এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, কৃষিপণ্যের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশ অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কৃষকের জন্য সহজ শর্তে মূলধন, উন্নত বীজ ও সার সরবরাহ এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য বাজারমূল্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি রাজস্ব আহরণের দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। ২০২৫ সালের জন্য কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৬ শতাংশ দেখানো হয়েছে। বিপরীতে, অনেক দেশে জিডিপির অন্তত ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ কর হিসেবে আহরণ করা হয়। এর কারণ করজালের সীমাবদ্ধতা, কর ফাঁকি, ব্যাপক কর অব্যাহতি, রাজস্ব আদায়ে জটিলতা এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতি। এছাড়া অটোমেশনে ধীরগতি এবং আদায় করা কর যথাযথভাবে সরকারি কোষাগারে জমা না হওয়ার মতো সমস্যাও রয়েছে। অর্থনীতির আকার বাড়লেও সব যোগ্য করদাতা ও প্রযোজ্য খাত করের আওতায় না আসায় রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না।
জিডিপি প্রবৃদ্ধির ধারায়ও ওঠানামা দেখা গেছে উল্লেখ করে এনবিআরের সাবেক এই চেয়ারম্যান জানান, ১৯৭২-১৯৮০ সময়ে বাংলাদেশের গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ছিল ২.৯৬ শতাংশ। ১৯৮১-১৯৯০ দশকে তা বেড়ে ৩.৮৪ শতাংশ, ১৯৯১-২০০০ দশকে ৪.৭৯ শতাংশ, ২০০১-২০১০ দশকে ৫.৫৮ শতাংশ এবং ২০১১-২০২০ দশকে ৬.৪৩ শতাংশে পৌঁছায়। তবে করোনা মহামারির পর ২০২১ সাল থেকে প্রবৃদ্ধি কমতে শুরু করে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকেও প্রবৃদ্ধির পরিবর্তন হয়েছে। ২০২১ সালের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.১০ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে তা ৩.৪৯ শতাংশ প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। একই সময়ে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় ২,১৩৮ ডলার থেকে বেড়ে ২,৯১১ ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাথাপিছু আয় বাড়লেও প্রবৃদ্ধির গতি দুর্বল হয়েছে।
বিশ্লেষণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে শুধু জিডিপি বা মাথাপিছু আয়ের বৃদ্ধি দিয়ে বিচার না করে আয়বণ্টন, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা এবং জীবনযাত্রার মানের দিকেও নজর দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আয়বৈষম্য বেশি হলে প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না; ফলে দারিদ্র্য হ্রাসের গতিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
প্রবন্ধের উপস্থাপক ড. আবদুল মজিদ তার সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির টেকসই অগ্রগতির জন্য উৎপাদনশীল খাতের বিকাশের পাশাপাশি রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, আর্থিক খাতের দুর্বলতা কমানো এবং নীতিগত সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। অর্থনীতির আকার বাড়ার সুফল উন্নয়ন ও জনসেবায় কাজে লাগাতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

