আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক আন্দোলন

আটকে আছে রমজানের ভোগ্যপণ্য, বাজার পরিস্থিতি অনিশ্চিত

সোহেল রহমান

আটকে আছে রমজানের ভোগ্যপণ্য, বাজার পরিস্থিতি অনিশ্চিত

চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান কর্মবিরতি ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে জাতীয় সংকটে। এটি এখন আর কেবল শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আসন্ন রমজানের পণ্যকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের কৌশল বন্দরে চলমান শ্রমিক আন্দোলন দেশের সরবরাহব্যবস্থা ও অর্থনীতিকে চাপে ফেলে দিচ্ছে। ফলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় শিল্পকারখানার কাঁচামাল থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের প্রবাহে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। বাজার-বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন রমজান সামনে রেখে বন্দরে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ ভোগ্যপণ্য বাজার পরিস্থিতিকে আরো অনিশ্চিত করে তুলছে।

সূত্র জানায়, কনটেইনার ওঠানামা ও পণ্য খালাস সীমিত হয়ে পড়ায় জেটি ও টার্মিনালে পণ্যজট তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে চালান ছাড় করা যাচ্ছে না, ফলে আমদানিকারকদের বাড়তি স্টোরেজ চার্জ গুনতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এ অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত বাজারদরে প্রতিফলিত হবে। ফলে আসন্ন রমজানের পণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সব মালামালে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে মূল্যচাপ বাড়িয়ে দেবে।

বিজ্ঞাপন

রমজান সামনে থাকায় উদ্বেগ আরো বেড়েছে। বন্দরে আটকে থাকা বিপুল খাদ্যপণ্য বাজারে সরবরাহ করা যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম বন্দরের ওয়েবসাইটে থাকা পোর্ট পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করে দেখা যায়, খালাসের অপেক্ষায় থাকা জাহাজের সংখ্যা ১২০টি ছাড়িয়ে গেছে। স্বাভাবিক সময়ে যার পরিমাণ থাকে ৬০টির নিচে। এর মধ্যে আমদানি করা পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে অন্তত ৩৫টি জাহাজ, যেগুলোতে খেজুর, ডাল, ছোলা, চিনি ও ভোজ্যতেলসহ রমজান মাসের গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রী রয়েছে। চলতি সপ্তাহে এসব পণ্য বাজারে না পৌঁছালে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

এই সংকটের সূত্রপাত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ঘিরে। জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও শ্রমিক ঐক্য পরিষদের (স্কপ) যৌথ উদ্যোগে ডাকা কর্মসুচির শুরুতে আট ঘণ্টার কর্মবিরতি ছিল। তবে এই আন্দোলন এখন অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে।

শ্রমিক নেতারা দাবি করছেন, দেশের লাভজনক একটি টার্মিনাল বিদেশি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার উদ্যোগ জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি। দাবি আদায় না হলে আরো কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা। এদিকে সাত দিনে ইয়ার্ডে কনটেইনারের সংখ্যা ৩৭ হাজার ছড়িয়েছে।

এ বিষয়ে আমার দেশের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে বন্দরের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি চট্টগ্রাম বন্দরের মুখপাত্র পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক। যদিও এর আগে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, রমজানের আগে এমন ধর্মঘট পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। আশা করছি, শ্রমিক-কর্মচারীরা এমন কর্মসূচি থেকে সরে আসবেন। তা না হলে কঠোর ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল আলম জুয়েল বলেন, বন্দরে একটি বড় জাহাজ একদিন অপেক্ষা করলেই গড়ে ২০ হাজার ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়। এখন জাহাজগুলোকে দিনের পর দিন নোঙর করে থাকতে হচ্ছে। এ অর্থ শেষ পর্যন্ত আমদানিকারকের মাধ্যমে ভোক্তার কাছ থেকেই আদায় হবে। তার মতে, রমজানের আগে এমন পরিস্থিতি বহুমুখী ক্ষতির কারণ হতে পারে।

পরিসংখ্যান বলছে, ধর্মঘট শুরুর পর পণ্য খালাস কার্যক্রম অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর প্রভাবে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের রাজস্ব আদায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা ইতোমধ্যে শতকোটি টাকার ক্ষতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষ একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। বন্দর এলাকায় সভা-সমাবেশ ও মিছিল এক মাসের জন্য নিষিদ্ধ করেছে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ। একই সঙ্গে অপারেশন সচল রাখতে শ্রম শাখায় নিবন্ধিত প্রায় সাত হাজার শ্রমিক-কর্মচারীকে নিয়মিত বুকিং দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কর্মবিরতির কারণে রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে।

আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া স্কপের যুগ্ম আহ্বায়ক ও শ্রমিক দল নেতা শেখ নুরুল্লাহ বাহার জানান, শ্রমিকরা জাতীয় স্বার্থে বন্দরের মতো প্রতিষ্ঠানকে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করে আসছে। বন্দরকে বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়া হবে না—এমন স্পষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ জানান, এক ঘণ্টা বন্দর অচল থাকাটাও আমরা কল্পনা করতে পারি না। সেখানে পাঁচদিনের বেশি বন্দর বন্ধ রয়েছে। কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না।

এদিকে যে চুক্তির আশঙ্কায় গত কয়েকদিন ধরে বন্দরকে অচল করে রাখা হয়েছে সে চুক্তি এখনো হয়নি। গত ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পিপিপি কর্তৃপক্ষের মধ্যস্থতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি স্বাক্ষরের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তা আর হয়নি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানান, চুক্তি নিয়ে তারা কিছু বলতে পারবে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...