আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস

ব্যাংক থেকে লক্ষ্যমাত্রার ৫৭ শতাংশ ঋণ নিয়েছে সরকার

রোহান রাজিব

ব্যাংক থেকে লক্ষ্যমাত্রার ৫৭ শতাংশ ঋণ নিয়েছে সরকার

হঠাৎ করেই আবার চাপে পড়তে শুরু করেছে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা। চলতি অর্থবছরের শুরুতে সরকার যেখানে ব্যাংক থেকে নেওয়া আগের ঋণ পরিশোধে মনোযোগী ছিল, সেখানে কয়েক মাসের ব্যবধানে পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে গেছে। অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে সরকারের ব্যাংকঋণ নেওয়ার গতি দ্রুত বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই ব্যাংক খাত থেকে লক্ষ্যমাত্রার ৫৭ শতাংশের বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সরকার ব্যাংকগুলো থেকে ৫৯ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা নিট ঋণ নিয়েছে, যা এ অর্থবছরের বাজেট লক্ষ্যমাত্রার ৫৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা।

বিজ্ঞাপন

চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস চারদিনে সরকার ব্যাংক খাত থেকে যে পরিমাণ ঋণ নিয়েছে, তা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৬১৯ শতাংশ বেশি। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে সরকার নিট ঋণ নিয়েছিল আট হাজার ৩১২ কোটি টাকা। যদিও চলতি অর্থবছরের ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারের ব্যাংকঋণ ৫০৩ কোটি টাকা কমেছিল।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, অর্থবছরের শুরুর দিকে সরকার উন্নয়ন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছিল। পাশাপাশি রাজস্ব আয়ের ভালো প্রবৃদ্ধি এবং বিদেশি ঋণপ্রাপ্তির কারণে সরকারের প্রাথমিকভাবে ঋণচাহিদা কম ছিল। তবে বর্তমানে উন্নয়ন ব্যয়ের গতি বৃদ্ধি, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে বিনিয়োগ, নির্বাচনি ব্যয় এবং ভর্তুকি ও সুদ পরিশোধের দায় বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা আবার বেড়েছে। এতে একদিকে সরকারের তাৎক্ষণিক অর্থসংস্থানের চাপ কিছুটা কমছে, অন্যদিকে ব্যাংক খাতে তারল্য পরিস্থিতি ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ডিসেম্বর মাসে সরকারের নির্ধারিত ঋণ গ্রহণের ক্যালেন্ডারের বাইরে আরো দুটি অতিরিক্ত অকশন নিলাম হয়েছে। তিনি বলেন, ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল এবং পাঁচ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের দুটি অতিরিক্ত নিলামের মাধ্যমে বাজার থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা তোলা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরের ৩০ জুন শেষে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের মোট ঋণের পুঞ্জীভূত স্থিতি ছিল চার লাখ ৫২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার লাখ ৮৮ হাজার ২৩২ কোটি টাকায়। ফলে অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস চারদিনে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বেড়েছে ৩৫ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। যদিও গত অর্থবছরের একই সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৩ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা।

অন্যদিকে গত অর্থবছরের ৩০ জুন শেষে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া সরকারের ঋণের স্থিতি ছিল ৯৮ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বেড়ে হয়েছে এক লাখ ২২ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা। ফলে এ সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ বেড়েছে ২৪ হাজার ৬ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সরকার ৫৪ হাজার ৯২৭ কোটি টাকা ঋণ ফেরত দিয়েছিল। সব মিলিয়ে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ১০ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা।

বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার প্রতি বছরই বড় অঙ্কের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়েছে। এবার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

গত অর্থবছরের মূল বাজেটে ব্যাংক থেকে এক লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৯৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়। একই অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার ব্যাংক থেকে নিট ৭২ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল, যা গত চার অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এটি ওই অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৬ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা কম।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন