চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় কমেছে। অন্যদিকে, ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বিদেশি ঋণের অর্থছাড়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখন সুদাসল পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে। ফলে অর্থনীতিতে চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বৃহস্পতিবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রকাশিত সর্বশেষ বিদেশি ঋণ পরিস্থিতির হালনাগাদ প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সরকারকে পুরোনো ঋণের সুদ ও আসল মিলিয়ে পরিশোধ করতে হয়েছে ৩৫২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩২১ কোটি ২০ লাখ ডলার। ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, উল্লিখিত সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে মোট বৈদেশিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি এসেছে ২৮০ কোটি ৪১ লাখ মার্কিন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩০০ কোটি ৫২ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার। অর্থাৎ প্রতিশ্রুতির পরিমাণ কমেছে ৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ। একই সময়ে ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে মোট অর্থছাড় হয়েছে ৩৮৯ কোটি ১৮ লাখ ডলার। এর মধ্যে ঋণ হিসেবে ৩৫০ কোটি ৬৭ লাখ ডলার এবং অনুদান হিসেবে ৩৮ কোটি ৫১ লাখ ডলার পাওয়া গেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে ছাড় হয়েছিল ৪০০ কোটি ৮৮ লাখ ডলার। এ হিসাবে অর্থছাড় কমেছে ১৯ শতাংশ।
ইআরডি কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচনকালীন সময়, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় ধীরগতির কারণে বিদেশি অর্থছাড় কমেছে। অনেক বড় প্রকল্পে দরপত্র যাচাই, চুক্তি অনুমোদন, নকশা সংশোধন ও ব্যয় পুনর্নির্ধারণের মতো কারণে সময়ক্ষেপণ হয়েছে। ফলে প্রতিশ্রুত অর্থ থাকলেও তা সময়মতো ছাড় হয়নি।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পাইপলাইনে থাকা বেশকিছু প্রকল্প নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে। এতে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নতুন ঋণচুক্তির গতি সাময়িকভাবে শ্লথ হয়েছে। তবে অর্থবছরের বাকি সময়ে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে তারা আশা করছেন। বিশেষ করে বাজেট সহায়তা হিসেবে প্রায় ৩২০ কোটি ডলার সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়ন হলে বৈদেশিক সহায়তার প্রবাহ বাড়তে পারে।
বিদেশি ঋণ নেওয়ার পাশাপাশি দেশি উৎস থেকে বিশেষ করে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকেও ঋণ নেওয়া বেড়েছে। বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে এক লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে। অবশ্য কিছু ঋণ শোধের ফলে এখন তা ৯৩ হাজার কোটি টাকায় নেমেছে। এর ফলে বিদেশি ঋণের পাশাপাশি দেশি ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো- ঋণ পরিশোধের চাপ বৃদ্ধি। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে মোট ঋণ পরিশোধ (মূলধন ও সুদ) দাঁড়িয়েছে ৩৫২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার, এটা আগের বছরে ছিল ৩২১ কোটি ২০ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৩০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বেড়েছে। এর মধ্যে মূলধন পরিশোধ বেড়ে ২২৭ কোটি ৬৪ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে এবং সুদ পরিশোধও বেড়ে ১২৪ কোটি ৮৫ লাখ ৯০ হাজার মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশি মুদ্রায় হিসাব করলে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৩ হাজার ৬১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের ৩৮ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই প্রবণতা ভবিষ্যতে বৈদেশিক ঋণের চাপ আরো বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, উন্নয়ন প্রকল্প সহায়তাই বিদেশি অর্থায়নের প্রধান উৎস হিসেবে রয়ে গেছে। খাদ্য সহায়তা খাতে সামান্য অর্থ ছাড় হলেও সামগ্রিক সহায়তার তুলনায় এ অংশ খুবই সীমিত। ফলে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পানিসম্পদ ও সামাজিক খাতের বড় প্রকল্পগুলোই বৈদেশিক ঋণের প্রধান গন্তব্য।
তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সবচেয়ে বেশি ঋণ ছাড় করেছে রাশিয়া, যার পরিমাণ প্রায় ৮৩ কোটি ডলার। এর পরেই রয়েছে বিশ্বব্যাংক- ৭৬ কোটি ডলার। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) দিয়েছে প্রায় ৬১ কোটি ডলার। এছাড়া চীন দিয়েছে ৫২ কোটি ডলার, জাপান ৩১ কোটি ডলার এবং ভারত দিয়েছে প্রায় ২৪ কোটি ডলার।
সরকার বাজেটের মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণ ও অনুদান নেয়। এছাড়া বেসরকারি খাতকেও উন্নয়ন সহযোগীরা ঋণ দেয়। বাজেট সহায়তা হিসেবে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ নিচ্ছে সরকার।
এএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

