আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের আগে প্রবাসী আয় বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রবাসীরা দেশে ৩১৭ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। গত বছরের জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স এসেছে ২১৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সামনে নির্বাচন অনেকে প্রার্থী বিদেশ থেকে তহবিল পাচ্ছে। তা রেমিট্যান্স আকারে আসছে। আবার সামনে রমজান পরিবারের খরচ মেটাতে অনেকে প্রবাসী আয় পাঠাচ্ছে। যার কারণে জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স বাড়ছে।
গত ডিসেম্বরে দেশে প্রবাসী আয় এসেছিল ৩২২ কোটি ডলার। তার আগে পাঁচ মাসে ৩ বিলিয়ন ডলারের কম প্রবাসী আয় এসেছে। তার মধ্যে নভেম্বরে সর্বোচ্চ ২৮৯ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছিল। গত জুলাই ও আগস্টে প্রবাসী আয় এসেছিল যথাক্রমে ২৪৮ ও ২৪২ কোটি ডলারের। সেপ্টেম্বরে কিছুটা বেড়ে ২৬৯ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। পরের মাসে কিছু কম, অর্থাৎ ২৫৬ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গত জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত ১ হাজার ৯৪৩ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২১ দশমিক ৮০ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরের ওই সময়ে প্রবাসী আয় এসেছিল ১ হাজার ৫৯৬ কোটি ডলার।
ব্যাংকাররা জানান, বিগত সরকারের সময় দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছে অর্থ পাচার। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কয়েকটি ব্যাংক দখল করে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে। দুর্নীতি, রাজস্ব ফাঁকি এবং নানা অনিয়ম-জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। সে কারণে নানা প্রণোদনা দেওয়ার পরও রেমিট্যান্স কমছিল। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে অর্থ পাচার বন্ধ হওয়ায় বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়ায় ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ইতিবাচক প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে দেখা যাচ্ছে।
দেশে ডলার সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক গত জুলাই থেকে ডলার কেনা শুরু করেছে। এ নিয়ে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক মোট ৩৯৩ কোটি ডলার বা ৩ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলার ক্রয় করেছে।
জানা গেছে, ২০২২ সালে দেশের ডলার বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। তখন প্রতি ডলারের দাম ৮৫ টাকা থেকে বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছায়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা পদক্ষেপ নিলেও ডলার বাজার নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। এক পর্যায়ে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি শুরু করতে হয়। এরপরও বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, গত তিন অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করেছে। এর মধ্যে, ২০২১-২২ অর্থবছরে সাত দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করা হয়। অথচ এ সময়ে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কেনা হয়েছে মাত্র এক বিলিয়ন ডলারের মতো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, বর্তমানে বাজারে ডলারের চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি রয়েছে। ডলারের দাম যেন অস্বাভাবিকভাবে কমে না যায়, সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনে বাজারে ভারসাম্য বজায় রাখছে। ডলারের দর কমে গেলে প্রবাসী আয় ও রপ্তানি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ডলার কেনার ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়েছে বলে জানান তিনি।
রেমিট্যান্স বৃদ্ধি ও ডলার ক্রয়ের ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। গত ২৯ জানুয়ারি শেষে মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। আর বিপিএম-৬ অনুযায়ী তা রয়েছে ২৮ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলার। দেশের ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করেছিল ২০২১ সালের আগস্টে। সেখান থেকে ধারাবাহিকভাবে কমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সময় রিজার্ভ নেমে আসে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

