চলতি অর্থবছরের শুরুতেই হয়েছিল জুলাই বিপ্লব। ফলে আওয়ামী লীগের ঘোষিত জনতুষ্টির বাজেটের পুরো অর্থবছরই গেছে রাজনৈতিক অস্থিরতায়। দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের বেশিরভাগ সময়ই ব্যয় হয়েছে অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে। গত কয়েক মাসে যোগ হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতাও। ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর চাপ অব্যাহত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে।
এটি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম বাজেট, এমনকি তাদের শেষ বাজেটও হতে পারে। সে বিষয়টি মাথায় রেখে রাজনৈতিক অস্থিরতার শঙ্কা ও অর্থনীতিতে টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যেই ২ জুন বাজেট ঘোষণা করবেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট হবে সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল সাত লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকার। সে হিসাবে প্রথমবারের মতো বাজেটের আকার কমেছে আট হাজার কোটি টাকা।
এবার জাতীয় সংসদ অচল থাকায় বাজেট ঘোষণা হবে টেলিভিশনে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বিটিভিসহ অন্যান্য বেসরকারি গণমাধ্যমে একযোগে প্রচার করা হবে। আগামীকাল সোমবার বিকাল ৪টায় অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের বাজেট বক্তব্য সম্প্রচার করা হবে।
বাজেট প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ আমার দেশকে বলেন, এবারের বাজেট জাতির কাছে উপস্থাপন করা হবে। স্বল্প সময়ে জনআকাঙ্ক্ষা পূরণ করা আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
অন্তর্বর্তী সরকার এমন সময় বাজেট দিচ্ছে, যখন আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক দুর্দশা কিছুটা কাটিয়ে ওঠার পথে ছিল। কিন্তু দেশের প্রধান কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচন নিয়ে তাগাদার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারও বাজেট ঘোষণা করছে রয়েসয়ে। অন্তর্বর্তী সরকার যে অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে মাঠে নেমেছিল, রাজনৈতিক দলগুলোর অসহযোগিতায় এখন তা প্রায় অসম্ভব।
অর্থনীতি স্বাভাবিক গতিতে চলার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ সরকারের মেয়াদ যতই বাড়ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর অসহযোগিতাও তত বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের যে পদক্ষেপ, তা ভেস্তে যাচ্ছে চাঁদাবাজি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে।
রাজনৈতিক দলগুলোর অসহযোগিতার কারণে বাজেট বাস্তবায়ন কতটুকু সম্ভব হবেÑজানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আমার দেশকে বলেন, দেখতে হবে রাজনীতিতে কোন ধরনের অস্থিতিশীলতা হয়। এখন প্রতিদিন না হলেও একদিন দুদিন পরই একটা কিছু হয়ে যায়। এটা যদি চলতে থাকে তাহলে অর্থনীতি হাঁটুভাঙা অবস্থায় হাঁটবে। ভাঙা হাঁটু নিয়ে আপনি নিজের পেটে ঢালবেন, নাকি সরকারের কোষাগারে দেবেন?
চলমান সংস্কার প্রসঙ্গে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এ পর্যন্ত আমরা ব্যবসায়ীদের রাস্তায় নামতে দেখিনি। আমার মনে হয় এ বাজেটের ছুতোয় তারাও নেমে যাবেন। এটা অর্থনৈতিকভাবে অর্জনযোগ্য নয়।
বাজেটের তিনভাগের একভাগই উন্নয়ন কর্মসূচির। ইতোমধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক কমিটি দুই লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন দিয়েছে। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা কম। নতুন অনুমোদিত এই এডিপিতে বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রাও ১৫ হাজার কোটি টাকা কমিয়ে ৮৫ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রায় নামানো হয়েছে। এডিপির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আসছে বাজেটে বড় বড় মেগা প্রকল্প থাকছে না।
দেশের মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এখনো তা নিয়ন্ত্রণে নেই। চলতি বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যামাত্রা রাখা হয়েছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ কিন্তু অর্থবছর শেষ হতে চললেও মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের উপরেই রয়েছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটেও মূ্ল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার ঘোষণা থাকবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের নিচে রাখা হবে।
এবারের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর চিন্তা রয়েছে সরকারের। নতুন বাজেটে ব্যক্তি করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ বা চার লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে বাড়তে পারে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক।
আগামী অর্থবছরে পাঁচ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের মূল লক্ষ্যমাত্রা ছিল চার লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে ওই লক্ষ্যমাত্রা সংশোধন করে চার লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।
ড. জাহিদ হোসেন আমার দেশকে বলেন, মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নামানোর লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য পরিস্থিতি কমার দিকে, ডলারের অবস্থাও দুর্বল। মুদ্রা বিনিময়হার যদি স্থিতিশীল থাকে, ডলারের জোগানে যদি কোনো সংকট তৈরি না হয়, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি আরো নামে, মুদ্রানীতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে অবস্থান রয়েছে তা যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে এ লক্ষ্য অর্জনযোগ্য।
তিনি বলেন, বাজেটের যে আকার সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে, তা অর্জনযোগ্য বলে মনে হয় না। এটি অর্জনে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি দরকার পাঁচ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা। কিন্তু আমরা চার লাখই তো কখনো অর্জন করতে পারিনি। এক বছরে তিন লাখ কোটি টাকার মতো রাজস্ব আদায় যদি বাড়াতে চান, এটা যাদের কাছ থেকে নেবেন তারা যে রাস্তায় নামবে না, সেটি বলা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, দুই লাখের বেশি ঘাটতি হলে বা এর উপরে উঠালে বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে। তাহলে সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাবেন কীভাবে?
চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা সামাল দেওয়া গেলেও প্রায় দুই বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধকলে দেশের বেকার এবং দারিদ্র্যের সংখ্যা বেড়েছে। বাজেটে দারিদ্র্যের জন্য দৃশ্যমান বরাদ্দ রাখা হয়। চলতি অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ছিল ১৪০টি। স্বচ্ছতা আনতে এ সংখ্যা কমিয়ে ১০০টির নিচে নামানো হচ্ছে। তবে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হবে ১০ লাখের বেশি। এর মধ্যে ৩৮টি কর্মসূচিকে ‘দারিদ্র্যবান্ধব’ হিসেবে ধরা হবে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর পরামর্শ অনুযায়ী করা হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতে বরাদ্দ রাখা হয় এক লাখ ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে তা এক লাখ ১৪ হাজার কোটিতে নামিয়ে আনা হচ্ছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগের কয়েকটি বাজেটে ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ বেড়েছে।
মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এবারের বাজেটে খাদ্য সহায়তার বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। চলতি বাজেটে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য সহায়তায় ভর্তুকির জন্য বরাদ্দ রাখা হয় সাত হাজার ৩০০ কোটি টাকা। নতুন বাজেটে বেড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা হচ্ছে। এ ছাড়া টিসিবির জন্য আগামী বাজেটেও রাখা হচ্ছে ১৯ হাজার কোটি টাকা।
চলতি বাজেটে কৃষি ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রাখা হয় ১৭ হাজার কোটি টাকা। আগামী বাজেটে তা ২০ হাজার কোটি টাকা হচ্ছে। এ বরাদ্দের প্রায় পুরোটাই সারে ভর্তুকি বাবদ দেওয়া হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

