আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

বিদ্যুতের স্মার্ট মিটার

এডিবির উচ্চ সুদে কপাল পুড়ল সোয়া ২ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকের

ইমদাদ হোসাইন

এডিবির উচ্চ সুদে কপাল পুড়ল সোয়া ২ লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহকের

এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের উচ্চ সুদের ঋণ নিয়ে সারা দেশের সিঙ্গেল ফেজ ও থ্রি-ফেজের মিটার বসানোর কাজ শুরু করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। প্রায় শেষ পথে এসে ৪ শতাংশ উচ্চ সুদের ঋণে শুরু হওয়া প্রকল্পটির সুদের এখন আরো ২ শতাংশ বাড়িয়ে ৬ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিনিয়োগকারী সংস্থাটি। এখন গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ কমিয়ে ব্যয় বাড়াতে বাধ্য হয়েছে বিপিডিবি।

চার বিভাগের বিদ্যুৎ গ্রাহকদের স্মার্ট মিটারের সুবিধা দিতে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) উচ্চ সুদের ঋণ নিয়ে প্রকল্প শুরু করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। ২০২২ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে এখন আবার সুদের হার বাড়িয়েছে বিনিয়োগকারী সংস্থাটি। এতে প্রকল্পটির ব্যয় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিপিডিবি। ব্যয় বাড়লে মূলত মিটার ব্যবহারকারীদের ঘাড়েই পড়বে উচ্চ সুদের বোঝা।

বিজ্ঞাপন

তবে প্রকল্প পরিচালক বলছেন, প্রকল্পটির ব্যয় বেড়েছে মূলত সুদের হার বেড়ে যাওয়ার কারণে। এ ছাড়া গ্রাহকসংখ্যা কমেছে সরকারের ব্যয় সাশ্রয়ী নীতির কারণে।

‘স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটারিং প্রজেক্ট ইন ডিস্ট্রিবিউশন জোনস অব বিপিডিবি’ নামের প্রকল্পটির অনুমোদন পায় ২০২২ সালে। বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। প্রকল্পটির মূল ব্যয় ধরা হয় ৬১৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এ প্রকল্পের ঋণ নেওয়া হয় এডিবির কাছ থেকে। প্রকল্পের এডিবির ঋণের পরিমাণ ৩২৯ কোটি টাকা।

এটি বাস্তবায়িত হলে ১০ লাখ ২০ হাজার সিঙ্গেল ফেজ স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার এবং ৩০ হাজার থ্রি-ফেজ স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপন করা হবে। এটিই ছিল মূল প্রকল্প প্রস্তাবের লক্ষ্যমাত্রা।

এডিবির ঋণের প্রকল্পটি যখন অনুমোদন নেওয়া হয়, তখনই সেটি ছিল উচ্চ সুদের ঋণ। ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে স্মার্ট মিটারের সিদ্ধান্ত নেয় বিপিডিবি। কিন্তু প্রকল্পের মাঝপথে এসে বিনিয়োগকারী সংস্থাটি এখন বলছে সুদের হার আরো দুই শতাংশ বাড়িয়ে ৬ শতাংশ করতে হবে। লোন পিরিয়ড বা ঋণ পরিশোধের সময় ছিল ২০ বছর, এখন তা কমিয়ে ১৫ বছর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে ব্যয় বাড়িয়ে গ্রাহকের সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিপিডিবি। এজন্য প্রকল্পটির সংশোধনী প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে।

সংশোধনী প্রস্তাবে প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ৭৭২ কোটি ৩ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। মিটারের সংখ্যা কমিয়ে ৭ লাখ ৯৭ হাজার ৫৮১টি সিঙ্গেল ফেজ স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার এবং ২৩ হাজার ৯৬৩টি থ্রি-ফেজ স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে সংশোধনী প্রস্তাবে সিঙ্গেল ফেজ স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটারের সংখ্যা মূল প্রকল্প প্রস্তাব থেকে দুই লাখ ২২ হাজার ৪১৯টি মিটার কমছে। তা ছাড়া থ্রি-ফেজ স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটারের সংখ্যা কমছে ৬ হাজার ৩৭টি; ডাটা কনসেন্ট্রেটর ইউনিট (ডিসিইউ) ১ হাজার ৭৫২টি এবং হ্যান্ড হেল্ড ইউনিট পাঁচটি কমানো হয়েছে।

তা ছাড়া শুরুতে চার বিভাগের ১৬ উপজেলা ও তিনটি সিটি করপোরেশনে এই মিটার স্থাপনের প্রস্তাব থাকলেও, সংশোধনীতে উপজেলার সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১০টিতে। ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগকে বাদ দিয়ে শুধু চট্টগ্রাম ও সিলেটকে রাখা হয়েছে। সিলেট বিভাগের মধ্যে শুধু সিলেট সিটি করপোরেশনে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে সংশোধনীতে। বাকি সবই বাস্তবায়িত হবে চট্টগ্রাম বিভাগে।

প্রকল্পটির সংশোধনের কারণ হিসেবে বিপিডিবি বলছে, এডিবির ঋণের সুদের হার ও লোন পিরিয়ডের পরিবর্তনের কারণে ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, মূল ডিপিপিতে এডিবির ঋণের সুদের হার ৪ শতাংশ এবং লোন পিরিয়ড ২০ বছর নির্ধারিত ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের ৮ জুন স্বাক্ষরিত সাবসিডিয়ারি লোন অ্যাগ্রিমেন্টে (এসএলএ) সুদের হার বাড়িয়ে ৬ শতাংশ এবং লোন পিরিয়ড কমিয়ে ১৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।

জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. মোজাহারুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, প্রকল্পটির ব্যয় বেড়েছে মূলত ডলারের দাম বাড়ার কারণে। আমরা যখন টেন্ডার করেছি তখন ডলারের দাম ছিল ৮৫ টাকা, এখন তা ১২০ টাকা।

এডিবির সুদের হার বাড়ার কারণ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক বলেন, এডিবির সুদের হার ৪ শতাংশ ছিল, তা এখন ৬ শতাংশ করা হয়েছে। তবে এখানে সরকারের সঙ্গে সংস্থাটির চুক্তি এখনো ৪ শতাংশই আছে। কিন্তু পিডিবি সরকারকে দেবে ৬ শতাংশ হারে।

মোজাহারুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছ থেকে ৩৫৩ কোটি টাকা পেয়েছিলাম। এডিবির টাকাটা ছিল ফিক্সড, ৩৯ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন ডলার। এটি ২০১২ সালের দিকে এক ঋণ প্রকল্পে এ অর্থ বেঁচে গিয়েছিল। পিডিবির এ টাকা আমরা প্রস্তাব করেছিলাম নতুন মিটার স্থাপনের কাজে লাগাব। বাকি টাকা পিডিবি ও এডিবির।

প্রকল্পে মিটারের সংখ্যা কমার কারণ হিসেবে মোজাহারুল ইসলাম বলেন, সরকারের ব্যয় সাশ্রয় পরিকল্পনার কারণেই মিটারের সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটি পরে আবার বাস্তবায়ন করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, প্রকল্পটি নিয়ে গত ২৩ জানুয়ারি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হয়েছে। প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতিও প্রায় শেষের দিকে। কাজ শুরু হওয়ার প্রায় দুই বছর ৯ মাসে প্রকল্পের আর্থিক ও বাস্তব অগ্রগতি প্রায় ৭০ শতাংশ।

বৈঠক সূত্র জানায়, সভায় প্রকল্পটির বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি প্রকল্পের কর্মপরিধিতে পরিবর্তনের ফলে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে কি না এবং সংশোধনী প্রস্তাবে যেসব কাজ বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে—সেগুলোর গুরুত্ব বিবেচনায় এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা জানতে চাওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া প্রকল্পের ডাটা কনসেন্ট্রেটর ইউনিট (ডিসিইউ) এবং হ্যান্ড হেল্ড ইউনিটের সংখ্যাও কমছে। মূল প্রস্তাবে ৮ হাজার ৮৩১টি ডাটা কনসেন্ট্রেটর ইউনিট (ডিসিইউ) এবং ২৫টি হ্যান্ড হেল্ড ইউনিটের সংস্থান ছিল। সংশোধনী প্রস্তাবে ৭ হাজার ৭৯টি ডিসিইউ ও ২০টি হ্যান্ড হেল্ড ইউনিটের প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে সংশোধিত ডিপিপিতে ‘রেন্ট বেইজ ট্রান্সপোর্ট’ শীর্ষক ১টি নতুন অঙ্গ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...