সেপ্টেম্বরেও কমেছে পিএমআই

নির্মাণ-উৎপাদন খাতে মন্দা কাটছে না, স্বস্তি কৃষিতে

নির্মাণ-উৎপাদন খাতে মন্দা কাটছে না, স্বস্তি কৃষিতে

সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (পিএমআই) কমেছে। মাসটিতে বাংলাদেশের পিএমআই দাঁড়িয়েছে ৪৮.৬-এ। গত আগস্টে এটি ছিল ৪৯.৯। এর মধ্য দিয়ে গত দুই মাস ধারাবাহিকভাবে পিএমআই কমতে দেখা গেছে। এটি দেশের সার্বিক অর্থনীতির সংকোচনের ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া সাম্প্রতিক মাসগুলোয় দেখা গেছে, দেশের বৃহৎ দুটি অর্থনৈতিক খাত— নির্মাণ ও উৎপাদন—দীর্ঘস্থায়ী মন্দার কবলে পড়েছে, যা থেকে উত্তরণের স্পষ্ট কোনো লক্ষণ এখনো দৃশ্যমান নয়। তবে এই চরম হতাশার মধ্যেও একমাত্র আশার আলো দেখাচ্ছে কৃষি খাত। প্রতিকূলতার মাঝেও কৃষির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের স্বস্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ঢাকা এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ (পিইবি) যৌথভাবে বাংলাদেশের সেপ্টেম্বরের পিএমআই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যুক্তরাজ্য সরকারের সহায়তায় এবং সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব পারচেজিং অ্যান্ড ম্যাটেরিয়ালস ম্যানেজমেন্টের (এসআইপিএমএম) কারিগরি সহায়তায় এমসিসিআই ও পিইবি যৌথভাবে বাংলাদেশের পিএমআই প্রণয়ন করেছে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের পিএমআই সেপ্টেম্বর মাসে আগের মাসের তুলনায় ১.৩ পয়েন্ট কমে ৪৮.৬-এ নেমে এসেছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংকোচন নির্দেশ করে। উৎপাদন খাতে অব্যাহত দুর্বলতা, নির্মাণ খাতে পুনরায় সংকোচন এবং সেবা খাতে প্রান্তিক সংকোচন সামগ্রিক সূচকের নিম্নমুখী হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। তবে কৃষি খাতে সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে।

কৃষি খাতে টানা ১৩ মাসের সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে, যদিও সেপ্টেম্বরে এই খাতের পিএমআই ১.৩ পয়েন্ট কমে ৫৫.২-এ দাঁড়িয়েছে। নতুন ব্যবসা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও কর্মসংস্থানে সম্প্রসারণের গতি কমেছে।

সেপ্টেম্বরে উৎপাদন খাতের পিএমআই ২.৬ পয়েন্ট কমে ৪৪.৮-এ নেমে গেছে। নতুন অর্ডার, নতুন রপ্তানি অর্ডার, উৎপাদন, কাঁচামাল ক্রয়ের মজুত, সমাপ্ত পণ্যের মজুত এবং আমদানি—সবগুলো সূচকই আগের তুলনায় দ্রুত হারে সংকুচিত হয়েছে। কর্মসংস্থান আবারও সামান্য সম্প্রসারণে ফিরে এসেছে।

নির্মাণ খাত আগস্টে সম্প্রসারণে থাকার পর সেপ্টেম্বরে পুনরায় সংকোচনে ফিরে এসেছে এবং এ খাতের পিএমআই ৩.৮ পয়েন্ট কমে ৪৮.৫-এ নেমেছে। নতুন ব্যবসা ও নির্মাণ কার্যক্রমে সংকোচন দেখা গেছে, তবে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেবা খাতে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো প্রান্তিক সংকোচন অব্যাহত রয়েছে এবং এ খাতের পিএমআই ০.২ পয়েন্ট কমে ৪৯.০-এ দাঁড়িয়েছে। নতুন ব্যবসা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পুনরায় সংকোচনে ফিরে এসেছে, কর্মসংস্থানে সংকোচনের গতি কিছুটা কমেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সেপ্টেম্বরের উত্তরদাতাদের মতামতে ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক ও মিশ্র প্রত্যাশা প্রতিফলিত হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত অর্ডার, নির্ভরযোগ্য ক্রেতা এবং আসন্ন শীতকাল ও ব্যবসার মৌসুমে চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনায় আগামী মাসগুলোয় ব্যবসায়িক কার্যক্রমের উন্নতির আশা করেছে। তবে অনেক উত্তরদাতা জ্বালানি তেলের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি, কাঁচামাল ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, ভোক্তাদের দুর্বল ক্রয়ক্ষমতা, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি এবং ব্যাংকঋণ প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মনে করেছে, সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে আগাম পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে; জ্বালানি ও অন্যান্য ব্যয়ের চাপ অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরো অবনতি হতে পারে।

সার্বিক বিষয়ে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, সেপ্টেম্বরে দেখা গেছে— উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতের দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতা এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে। কৃষি খাতের অব্যাহত সম্প্রসারণ অর্থনীতিতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এনেছে। একই সঙ্গে, সবগুলো খাতেই সামান্য ইতিবাচক প্রত্যাশা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি সম্ভাবনাময় ভিত্তি তৈরি করছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি পুনরুদ্ধারে অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানি চাহিদা জোরদার করা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা কমানো এবং ব্যয় বৃদ্ধির চাপ নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

এদিকে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাই মাসে উৎপাদন খাতের সূচক ৬৫.৪ পয়েন্টে থাকলেও আগস্টে তা এক ধাক্কায় ৪৭.৪ পয়েন্টে এবং সেপ্টেম্বরে আরও কমে ৪৪.৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে। একইভাবে আবাসন ও অবকাঠামো খাতের মূল চালিকাশক্তি নির্মাণ খাতের অবস্থা আরও নাজুক। বিগত কয়েক মাস ধরেই এই খাতটি ৫০ পয়েন্টের নিচে অবস্থান করছে। গত এপ্রিল মাসে এটি ৪৪.৬ পয়েন্টে এবং জুন মাসে ইতিহাসের অন্যতম সর্বনিম্ন ৪০.২ পয়েন্টে নেমে এসেছিল। সবশেষ সেপ্টেম্বর মাসেও এই সূচক ৪৮.৫ পয়েন্টে আটকে রয়েছে, যা প্রমাণ করে নির্মাণ খাতের স্থবিরতা ও মন্দা কোনোভাবেই কাটছে না। কাঁচামালের উচ্চ মূল্য, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং নতুন বিনিয়োগের অভাব এই দুই খাতকে ক্রমাগত পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে বিপরীতে চিত্র দেখা গেছে কৃষি খাতে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত কৃষি খাত এই প্রতিকূল সময়েও চমৎকার সহনশীলতা প্রদর্শন করেছে। সূচক অনুযায়ী, গত এক বছরের কোনো মাসেই কৃষি খাতের সূচক ৫০ পয়েন্টের নিচে নামেনি। এমনকি আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে যখন অন্য সব খাত মন্দার কবলে পড়েছে, তখনো কৃষির পিএমআই যথাক্রমে ৫৬.৫ এবং ৫৫.২ পয়েন্টের শক্তিশালী অবস্থানে বজায় রয়েছে। বিগত মাসগুলোতেও এই খাতে অভাবনীয় সম্প্রসারণ দেখা গিয়েছিল। বর্তমানের এই ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে যে, দেশের অভ্যন্তরে নানা অর্থনৈতিক সংকট ও মুদ্রাস্ফীতি থাকা সত্ত্বেও কৃষি উৎপাদন সচল রয়েছে, যা সামগ্রিক খাদ্য সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে প্রধান ভূমিকা রাখছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...