নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা আজ

সুদ বাড়িয়েও মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি কমানো যায়নি

রোহান রাজিব

সুদ বাড়িয়েও মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি কমানো যায়নি

নীতি সুদহার ১০ শতাংশে রেখে দেড় বছরের বেশি সময় কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখলেও মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশ ব্যাংকের ৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রায় নামানো যায়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজেই বলেছে, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা পদক্ষেপ সত্ত্বেও চলতি বছরের জুন পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি। এর জন্য দুর্বল বাজারব্যবস্থা, সরবরাহ শৃঙ্খল সমস্যা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যমূল্যের চাপকে দায়ী করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মুদ্রানীতি পর্যালোচনায় এমনটাই তুলে ধরেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে রাখা হয়েছিল। ওই বছরের ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ থেকে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে এলেও তা বাংলাদেশ ব্যাংকের ৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার অনেক ওপরে ছিল। তাই চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়েও একই ধরনের কঠোর মুদ্রানীতি রাখা হয়। কিন্তু এরপরও চলতি বছরে মে মাসে মূল্যস্ফীতি আবার ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে উঠে যায়। তাই সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখা প্রয়োজন, যাতে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা নিয়ন্ত্রণে থাকে।

বিজ্ঞাপন

তিন বছরের বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতির চাপ

মুদ্রানীতি পর্যালোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, মূল্যস্ফীতির চাপ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি প্রধান প্রতিকূলতা হিসেবে রয়ে গেছে। টানা তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের অর্থনীতি ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে রয়েছে। এ সময় পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি প্রায় পুরো সময়ই ৯ শতাংশের আশপাশে ছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের শুরুতে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক পণ্যমূল্যের ধাক্কা থেকে এই দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির সূত্রপাত হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুনে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তা বেড়ে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ। এরপর কঠোর মুদ্রানীতির প্রভাবে ২০২৬ সালের মার্চে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু সেই ধারা স্থায়ী হয়নি; মে মাসে আবার ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ উঠে যায়।

কোন কোন খাতে মূল্যস্ফীতি বেশি

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, খাদ্যের পাশাপাশি পরিবহন এবং আবাসন-জ্বালানি খাতও মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর বড় উৎসে পরিণত হয়েছে। এক বছরে পরিবহন খাতে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং আবাসন, পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি খাতে ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ২৬ শতাংশে উঠেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, জ্বালানি ভর্তুকি কমানো, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং গ্যাস, পেট্রোল ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে এই ব্যয় চাপ তৈরি হয়েছে, যা পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দিয়েছে।

ধীরে ধীরে কমবে—বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বাভাস

২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে না; বরং একাধিক নীতি ও অর্থনৈতিক শর্ত পূরণ হলে মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী হবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখা হবে, যাতে বাজারে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে থাকে। একই সঙ্গে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি, আমদানি ও সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক হওয়া এবং বৈশ্বিক পণ্যমূল্যের চাপ কমে এলে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে হ্রাস পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির মধ্যে আরো সমন্বয়, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ বাড়াতে সরকারের পদক্ষেপও মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক হবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরো বলেছে, মূল্যস্ফীতির প্রভাব কমাতে সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিভিন্ন লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালিয়ে যাবে, যাতে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কিছুটা সুরক্ষিত থাকে। একই সঙ্গে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের মাধ্যমে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি খাতের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে উদ্বৃত্ত তারল্য উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হবে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত হবে। তবে তা যেন অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি না করে সেদিকেও নজর রাখা হবে।

আজ নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা

এমন প্রেক্ষাপট সামনে রেখে আজ মঙ্গলবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এদিন বেলা ৩টায় গভর্নর মোস্তাকুর রহমান মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন বলে গতকাল সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি এখনো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে না আসায় এবারের মুদ্রানীতিতেও সতর্ক অবস্থান বজায় রাখতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবারও সংকোচনমূলক নীতির ধারা অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত মিলেছে। ফলে নীতি সুদহার ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রাখা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...