ছোটখাটো বিষয় থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও যদি বারবার মনে না থাকে, তবে এর পেছনে থাকতে পারে একাধিক কারণ। অতিরিক্ত ক্লান্তি, মানসিক চাপ, কর্মব্যস্ততা, কোভিড-পরবর্তী প্রভাব, পর্যাপ্ত ঘুম ও পুষ্টির অভাব কিংবা থাইরয়েডজনিত সমস্যার কারণে সাময়িকভাবে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ও স্মৃতিশক্তি কমে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা বর্তমানে তরুণ কর্মজীবীদের মধ্যেও ক্রমশ বাড়ছে।
পানিশূন্যতা: মস্তিষ্কের নীরব শত্রু
পুষ্টিবিদদের মতে, পর্যাপ্ত পানি পান না করাই স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হলে শুধু কিডনি বা অন্যান্য অঙ্গই নয়, মস্তিষ্কের কার্যকারিতাও ব্যাহত হয়।
বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ডেস্কে বসে কাজ, বাইরে ব্যস্ত কর্মসূচি, অনিয়মিত খাবার, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং ঘন ঘন চা-কফি পান করার অভ্যাস শরীরে ধীরে ধীরে পানিশূন্যতা তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিন এই অবস্থা চলতে থাকলে অকালবার্ধক্য, বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং গুরুতর অসুস্থতার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।
পানিশূন্যতা কীভাবে মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করে?
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, শরীরের ওজনের মাত্র ২ শতাংশ পানি কমে গেলেই ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা হিসেবে ধরা হয়। এ অবস্থায় মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো মানসিক সক্ষমতা কমে যেতে পারে।
শরীরে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে কোষগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের গতি ধীর হয়ে যায়। ফলে মস্তিষ্কের নিউরনগুলো স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না এবং একই কাজ সম্পন্ন করতে শরীরের বেশি শক্তি প্রয়োজন হয়। এর ফলেই চিন্তা করা, নতুন তথ্য মনে রাখা কিংবা হিসাব-নিকাশের মতো কাজ কঠিন হয়ে ওঠে।
স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার আরও যেসব কারণ রয়েছে
বার্ধক্য: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তথ্য মনে রাখতে কিছুটা সময় লাগা স্বাভাবিক। তবে অতিরিক্ত স্মৃতিভ্রংশ স্বাভাবিক বার্ধক্যের লক্ষণ নয়; এটি ডিমেনশিয়া বা আলঝাইমারের মতো রোগের ইঙ্গিত হতে পারে।
ঘুমের অভাব: পর্যাপ্ত ঘুম নতুন তথ্য সংরক্ষণে মস্তিষ্ককে সাহায্য করে। অনিদ্রা বা স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো সমস্যা স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি: ভিটামিন বি১২-এর অভাবে বিভ্রান্তি, মনোযোগের ঘাটতি এবং স্মৃতিশক্তি দুর্বল হতে পারে। প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করলে অনেক ক্ষেত্রেই এসব সমস্যা কমে আসে।
মাথায় আঘাত: ছোট বা বড় যেকোনো ধরনের মাথার আঘাত স্মৃতি সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। গুরুতর আঘাতে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিশক্তির সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: কিছু সিডেটিভ, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট, ব্যথানাশক ও অ্যান্টিহিস্টামিনজাতীয় ওষুধ স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগে প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন ওষুধ শুরুর পর এমন সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত।
স্নায়বিক রোগ: আলঝাইমার, পারকিনসন, ডিমেনশিয়া বা মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের মতো রোগ ধীরে ধীরে স্নায়ুকোষের ক্ষতি করে, যার ফলে স্মৃতিশক্তি, বিচার-বিশ্লেষণ ও চিন্তাশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
সংক্রমণ বা স্ট্রোক: মেনিনজাইটিস, এনসেফালাইটিসের মতো মস্তিষ্কের সংক্রমণ কিংবা স্ট্রোকের কারণে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হলে হঠাৎ স্মৃতিশক্তি কমে যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এই সমস্যা দীর্ঘস্থায়ীও হতে পারে।
কী করবেন?
সুস্থ মস্তিষ্ক ও ভালো স্মৃতিশক্তি বজায় রাখতে প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান, সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় শারীরিক ব্যায়াম গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি স্মৃতিশক্তির সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকলে বা দ্রুত বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এসআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


