রাস্তায় এআই ক্যামেরায় সাফল্য

আরিফ বিন নজরুল

রাস্তায় এআই ক্যামেরায় সাফল্য

ঢাকার যানজট যেন নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিদিন কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা জরুরি গন্তব্যে পৌঁছাতে লাখো মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে কাটাতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে ট্রাফিক আইন অমান্য। উল্টোপথে যান চলাচল। অবৈধ পার্কিং, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং সিগন্যাল ভঙ্গের মতো সমস্যাগুলো রাজধানীর সড়ক ব্যবস্থাপনাকে আরো জটিল করে তুলেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উদ্যোগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরা ব্যবহারের ফলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। প্রযুক্তির এই ব্যবহার শুধু আইন প্রয়োগকেই সহজ করেনি। বরং চালকদের আচরণেও ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্থাপিত এআই ক্যামেরাগুলো সাধারণ সিসিটিভির মতো শুধু ভিডিও ধারণ করে না। এগুলো ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনাও স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করতে পারে। বর্তমানে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত ১১০টি এআই-সক্ষম ক্যামেরা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এসব ‘প্যান-টিল্ট-জুম’ (PTZ) ক্যামেরা ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরতে পারে। দূর থেকে নম্বরপ্লেট শনাক্ত করতে পারে এবং চলন্ত যানবাহনকে অনুসরণ করতে সক্ষম। ফলে কোনো যানবাহন সিগন্যাল অমান্য করলে, উল্টোপথে চললে কিংবা নির্ধারিত নিয়ম ভঙ্গ করলে তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এআই প্রযুক্তির কার্যকারিতা এরই মধ্যে পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে। পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পর মাত্র এক মাসের মধ্যেই শত শত ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে এবং ৬৮৯টি যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মামলা হয়েছে বাসের বিরুদ্ধে। ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ মামলা হয়েছে সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি। অবৈধভাবে গাড়ি থামানো এবং লেন শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে। আগে যেসব অপরাধ অনেক সময় নজর এড়িয়ে যেত। এখন প্রযুক্তির কারণে সেগুলো সহজেই ধরা পড়ছে।

প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত মানুষের আচরণগত পরিবর্তনে। রাজধানীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এখন চালকদের জেব্রা ক্রসিংয়ের আগে থামতে দেখা যাচ্ছে। সিগন্যাল অমান্য করা কিংবা উল্টোপথে গাড়ি চালানোর প্রবণতাও কিছুটা কমেছে বলে ট্রাফিক কর্মকর্তারা মনে করছেন। কারণ চালকরা জানেন, ট্রাফিক পুলিশ না থাকলেও ক্যামেরা তাদের প্রতিটি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছে। ফলে আইনের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আনুগত্য তৈরি হওয়ার একটি পরিবেশ গড়ে উঠছে। এআই ক্যামেরার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বচ্ছতা। আগে অনেক ক্ষেত্রেই ট্রাফিক আইন প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠত। কিন্তু এখন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ও তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সফটওয়্যার প্রথমে আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত করে। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যাচাই করে মামলা অনুমোদন দেয়। এতে মানবিক ভুল বা পক্ষপাতিত্বের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কমে আসে।

তবে এই সাফল্যের মধ্যেও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। নিবন্ধনবিহীন ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এখনো কঠিন। অনেক যানবাহনের নম্বরপ্লেট অস্পষ্ট বা আংশিক ঢেকে রাখা থাকায় সেগুলো শনাক্ত করতেও সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া প্রযুক্তির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল এবং তথ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তবু সামগ্রিকভাবে এআই প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ঢাকার সড়কে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। ডিএমপির পরিকল্পনা অনুযায়ী ভবিষ্যতে রাজধানীর সব সিগন্যাল পয়েন্টে এ ধরনের ক্যামেরা স্থাপন করা হলে এর সংখ্যা প্রায় ৫০০-তে পৌঁছাবে। তখন শুধু আইন প্রয়োগ নয়। ট্রাফিক প্রবাহ বিশ্লেষণ। যানজট ব্যবস্থাপনা এবং স্মার্ট সিটি গঠনের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একসময় ঢাকার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ বলতে বোঝানো হতো মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একজন পুলিশ সদস্যকে। এখন সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্যামেরা এবং ডেটা বিশ্লেষণের সমন্বয়ে গড়ে উঠছে নতুন এক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো। প্রযুক্তির এই যাত্রা সফলভাবে এগিয়ে গেলে ভবিষ্যতের ঢাকা হতে পারে আরো শৃঙ্খলাবদ্ধ, নিরাপদ এবং স্মার্ট একটি নগরী।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন