ঘরে অলস পড়ে থাকা নগদ টাকা ব্যাংকে ফিরিয়ে আনতে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের একটি প্রস্তাব এসেছে। জাতীয় সংসদে একজন সংসদ সদস্য এই প্রস্তাব করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে নানা আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। ফলে বড় এই ব্যাংক নোট দুটি আগের মতোই সচল রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্বের অনেক দেশেই ব্যাংক নোট বাতিলের ইতিহাস আছে। বাংলাদেশেও অতীতে মুদ্রা বাতিলের নজির রয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, এটি কোনো স্বাভাবিক সময়ের ঘটনা নয়। সাধারণত অস্বাভাবিক সময় বা বিশেষ পরিস্থিতিতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সংসদে কী বলা হয়েছিল?
সংসদের চলমান দ্বিতীয় অধিবেশনে ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের এই প্রস্তাবটি করেন বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি দাবি করেন, মানুষের কাছে নগদ টাকা থাকার পরও আস্থা না থাকায় তারা তা ব্যাংকে রাখছেন না। স্বৈরাচারদের রেখে যাওয়া এবং ঘরে ঘরে থাকা এই অর্থ ব্যাংকে ফেরাতে তিনি নোট দুটি বাতিলের প্রস্তাব করেন।
একই সঙ্গে পুরনো নোট ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য দুই মাস সময় বেঁধে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এতে আড়াই লাখ কোটি টাকার মতো নোট বৈধ হবে, বাজেট ঘাটতি পূরণ হবে এবং অর্থনৈতিক চাকা ঘুরবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নোট বাতিল করা হয় কেন?
একটি দেশের সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রধানত কালো টাকার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে তা ব্যাংকিং খাতে যুক্ত করার জন্য ব্যাংক নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর বলেন, দেশে কালো টাকার পরিমাণ বেশি হলে এবং মানুষের কাছে নগদ অর্থ থাকলে তা ব্যাংকে ঢোকানোর জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আয়ের হিসাবে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কর ফাঁকি দেওয়া টাকাই মূলত কালো টাকা। এর মধ্যে ঘুষ-দুর্নীতির টাকা যেমন রয়েছে, তেমনি সৎ পথে আয় করে কর না দেওয়া টাকাও এর অন্তর্ভুক্ত।
কালো টাকার পাশাপাশি জাল নোটের প্রসার ঠেকাতেও মুদ্রা বাতিল করা হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে জাল টাকার দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণে জলছাপবিহীন একাধিক নোট বাতিল করেছিল তৎকালীন সরকার। এছাড়া দুর্নীতি ও সন্ত্রাস দমনে ২০১৬ সালে ভারত সরকারও ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিল করেছিল। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন ঘটলেও নতুন মুদ্রা চালু করা হয়। এর ফলে ব্যাংকে তারল্য এবং সরকারের আয়কর সংগ্রহ বাড়ে।
সফলতা কতটা আসে?
অর্থনীতিবিদরা জানান, অতীতে বিভিন্ন দেশে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও খুব কম দেশই সুফল পেয়েছে। ড. মাহফুজ কবীর বলেন, বেশিরভাগ দেশে অর্থনীতি খুব একটা লাভবান হয়নি। কারণ কালো টাকার মালিকরা অন্যদের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে পুরনো নোট বদলে নতুন নোট সংগ্রহ করে ফেলে।
ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সুফল মিললেও দীর্ঘমেয়াদে উল্টো প্রভাব পড়ে। ব্যাংকে হঠাৎ তারল্য বাড়লেও তা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা যায় না, অথচ গ্রাহককে সুদ দিতে হয়। এতে ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আবার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা পরবর্তীতে ক্ষতি পোষাতে ঘুষ-দুর্নীতি বা কালো টাকার ব্যবহার আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই বিশেষজ্ঞরা মুদ্রা বাতিল না করে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের ওপর জোর দেন।
মুদ্রা বাতিলের ঝুঁকিগুলো কী কী?
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সিদ্ধান্তে লাভের চেয়ে ক্ষতির অংশই বেশি। প্রথম ক্ষতি হলো সরকার ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হওয়া। নোট বাতিলের ঘোষণা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
সবাই তাড়াহুড়ো করে ব্যাংকে টাকা জমা দিতে চাওয়ায় নগদ অর্থের সংকট দেখা দেয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে। সাধারণ মানুষ মনে করে সরকার যেকোনো সময় যেকোনো মুদ্রা বাতিল করতে পারে। এই অবিশ্বাস থেকে অনেকে বিকল্প হিসেবে স্বর্ণ বা ডলারের মতো অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ায়, যা ওই বাজারগুলোতে বাড়তি চাপ তৈরি করে।
তাছাড়া, পুরনো নোট বাতিল করে নতুন নোট ছাপাতে সরকারের বাড়তি ব্যয় হয়। ১৯৮৪ সালে নাইজেরিয়ায় সামরিক সরকার নতুন নোট ছাপাতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল এবং দেশে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছিল।
অন্য দেশের অভিজ্ঞতা
২০১৬ সালে ভারতে মোদি সরকার দুর্নীতি, কালো টাকা ও জাল নোট বন্ধে ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিল করে। এতে দেশের ৮৬ শতাংশ নগদ অর্থ রাতারাতি অচল হয়ে যায় এবং দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কাঁচাবাজার ও ব্যবসায়ীরা পুরনো নোট নেওয়া বন্ধ করে দিলে মানুষ ব্যাংকে ভিড় করে এবং অর্থ সংকট চরমে পৌঁছায়। পরিস্থিতি সামলাতে বিমানবাহিনীর সাহায্যে বিভিন্ন রাজ্যে নতুন নোট পৌঁছানো হয়।
নতুন নোট ছাপাতে ও বণ্টন করতে ভারত সরকারের সে বছর সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হয়। এছাড়া ব্যাংকে আমানত বেড়ে যাওয়ায় রিজার্ভ ব্যাংককে অন্যান্য ব্যাংকগুলোকে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা সুদ দিতে হয়েছিল। এত কিছুর পরও বাতিল হওয়া নোটের প্রায় ৯৯ শতাংশই ব্যাংকে জমা পড়েছিল। ফলে কালো টাকা উদ্ধারের লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ড. মাহফুজ কবীর বলেন, ভারতের এই অভিজ্ঞতা থেকেই বোঝা যায় যে ব্যাংক নোট বাতিল করা কার্যকর কোনো সমাধান নয়।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


