চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন কারখানায় পোকা, ছত্রাক ও পচে যাওয়া নিম্নমানের আম থেকে জুসের কাঁচামাল ‘পাল্প’ তৈরির অভিযোগ উঠেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে পোকা ও ছত্রাকের আক্রমণে নষ্ট, পচা, ফাটা ও গলে যাওয়া খাবার অনুপযোগী আম থেকে পাল্প তৈরির অভিযোগ উঠেছে এক আওয়ামী লীগ নেতার প্রস্তুতকারক কোম্পানির বিরুদ্ধে। এসব আমের পাল্প কিনে নিচ্ছে দেশের নামিদামি জুস কোম্পানিগুলো।
১০০ টাকা মণ দরে এসব নিম্নমানের আম সংগ্রহের পর তা থেকেই প্রস্তুত হচ্ছে আমের জুসের প্রধান কাঁচামাল পাল্প। প্রস্তুতকারক কোম্পানির মালিক বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট বাজার সরগরম আশ্বিনা জাতের আমে। এ বাজারেই গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক আমের আড়ত। বাজার ও এসব আড়তে কাঁচা ও পাকা জাতের আশ্বিনা আম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ হতে ২ হাজার টাকা মণ দরে। অথচ একই বাজারে একই জাতের আম মিলছে ১০০ টাকা মণ দরেও। তাও প্রতি মণ আমে কৃষককে দিতে হচ্ছে ৫২-৫৫ কেজি। পোকা ও ছত্রাকের আক্রমণে পচে নষ্ট হয়ে যাওয়া, ফাটা ও গলে যাওয়া খাবার অনুপযোগী এসব আম নামমাত্র মূল্যে কিনে নিচ্ছেন আড়তদাররা। এরপর এসব আম যাচ্ছে পাল্প প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোতে। আমচাষি ও আড়তদাররা জানান, বিভিন্ন পোকা ও নানারকম ছত্রাকের আক্রমণ এবং অতিরিক্ত বৃষ্টির প্রভাবে চলতি বছর আশ্বিনা আমের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কৃষকরা জানান, কৃষকের কাছে সংগ্রহের পর পচা নষ্ট হওয়া এসব আম যায় গোমস্তাপুর উপজেলার গোলাম মোস্তফা ফিটুর মালিকানাধীন চাঁপাই এগ্রো প্রোডাক্ট ফ্যাক্টরিতে। এরপর এ আম থেকেই তৈরি হয় জুসের প্রধান কাঁচামাল পাল্প। এসব পাল্প কিনে নেয় দেশের নামিদামি জুস কোম্পানি। ফ্যাক্টরিতে গিয়েও দেখা যায়, ড্রামে খোলা আকাশের নিচেই রাখা হয়েছে প্রস্তুত করা পাল্প। এমনকি এসব পাল্পের ড্রামের ওপরে জমেছে বৃষ্টির পানি। এমন পচা, গলে যাওয়া আম থেকে পাল্প তৈরির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি সচেতন আমচাষি, কৃষক নেতার। কৃষক আবদুল আওয়াল জানান, কানসাট বাজারে অর্ধশতাধিক আড়তে এসব পচা নষ্ট আম কিনে নেওয়া হয় নামমাত্র মূল্যে। অথচ মাত্র ১০০ টাকারও বেশি খরচ হয় ৫০-৫৫ কেজি আম বাজারে আনতে। কিন্তু কোনো উপায় না থাকায় বাধ্য হয়েই এমন দামে আম বিক্রি করতে হচ্ছে কৃষকদের। কৃষি উদ্যোক্তা মুনজের আলম মানিক বলেন, পাল্প তৈরির অনেকগুলো ধাপ আছে। তবে জীবাণুযুক্ত ও পচা নষ্ট আম দিয়ে পাল্প তৈরির সময় এসব ধাপে তা বিনষ্ট না করলে এটি কোনোভাবেই স্বাস্থ্যসম্মত নয়।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর বিষয়টি খতিয়ে দেখবে ও কঠোর নজরদারি বৃদ্ধি করবে বলে আশা করি। আমিনুল হক সোনা বলেন, জুসের অন্যতম প্রধান ক্রেতাই হলো শিশুরা। বিজ্ঞাপনগুলোতে নিরাপদ ও সুমিষ্ট আম থেকে জুস তৈরির কথা বললেও পচা, নষ্ট হওয়া আম থেকে জুস তৈরির বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। কারণ কোমলমতি শিশুরা এতে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে। ফ্যাক্টরি মালিক ও গোমস্তাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি গোলাম মোস্তফা ফিটু বলেন, ফ্যাক্টরিতে পচা, নষ্ট, খাবার অনুপযোগী আম এলেও পাল্প তৈরির প্রক্রিয়ার সময় আমের সেই অংশ কেটে ফেলে দেওয়া হয় বলে দাবি করেন। তিনি বলেন, সব নিয়ম সঠিকভাবে মেনেই পাল্প তৈরি করা হয়। আমাদের পাল্প কিনে নেয় দেশের নামিদামি জুস প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো। আমাদের পাল্প নেওয়ার আগে তারা নমুনা সংগ্রহ করার পরই নিশ্চিত হলে কিনে নেয়। পচা আম দিয়ে পাল্প উৎপাদনকে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি উল্লেখ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ-এর নিরাপদ খাদ্য অফিসার
মো. শাকিলুজ্জামান বলেন, এ ধরনের আম স্বাস্থ্যসম্মত নয়। পচা আম ব্যবহারের মাধ্যমে পাল্প তৈরি করা হয় সেটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ জানিয়ে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম বলেন, এমন আম বিক্রি, কেনা ও পাল্প তৈরির সঙ্গে জড়িতেদর আইনের আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে বিক্রেতাদের সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানান এ কর্মকর্তা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

