মিসরে চলতি আগস্ট মাসে একের পর এক হত্যাকাণ্ড ও পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে। মাত্র এক মাসে কয়েক ডজন মানুষ হত্যার শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তান ও অন্য ঘনিষ্ঠ স্বজনদেরও লক্ষ্য করা হয়েছে।
আলেকজান্দ্রিয়ার এল-আগামি এলাকায় সমুদ্রসৈকতে বসার জায়গা নিয়ে বিরোধের জেরে রেনিয়া নামের ২৭ বছর বয়সি এক নারীকে এক সৈকতকর্মী হত্যা করেন। স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে ছুটি কাটাতে গিয়ে প্রাণ হারান তিনি।
আগস্টে মিসরের বিভিন্ন এলাকায় আরও কয়েকটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সোহার গভর্নরেটে এক ব্যক্তি স্ত্রীর পরকীয়ার সন্দেহে স্ত্রীসহ তিনজনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। কায়রোর দক্ষিণে ১৫ মে সিটিতে এক প্রকৌশলী সাবেক স্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে সমঝোতা বৈঠকের সময় গুলি চালিয়ে চারজনকে হত্যা করেন। নিহতদের মধ্যে তার নিজের মেয়েও ছিল।
কায়রোর আল-তাগামোয়া এলাকায় অর্থ ধার দিতে অস্বীকৃতি জানানোর জেরে এক পরিবারের চার সদস্যকে গুলি করে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া রাজধানীর জেইতুন এলাকায় এক ব্যক্তি নিজের মাকে হত্যা করে তার লাশ ঘরের দেয়ালের ভেতরে লুকিয়ে রাখেন। দুই বছর পর লাশের সন্ধান পাওয়া যায়। আরেক ঘটনায় পারিবারিক বিরোধের জেরে এক আইনজীবী তার বাবাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন।
দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে সহিংসতার আরও ঘটনা ঘটেছে। দাকাহলিয়া গভর্নরেটে এক নারী তার আট বছর বয়সি ছেলেকে হত্যা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মনুফিয়া প্রদেশে পারিবারিক বিরোধের জেরে এক ব্যক্তি ভাইকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। আলেকজান্দ্রিয়ায় এক আইনজীবীর বিরুদ্ধে মাকে হত্যা করে লাশ টুকরো করার অভিযোগও উঠেছে।
পরিসংখ্যানেও সহিংসতা বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। মিসরের ইদরাক ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ইকুয়ালিটির অধীন সহিংসতার শিকার নারী ও মেয়েদের অপরাধ পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ৫৯৮টি সহিংস অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৪৯৫। অর্থাৎ এক বছরে সহিংস অপরাধ বেড়েছে ২০ দশমিক ৮১ শতাংশ।
নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে ২৪৫টি বা প্রায় ৪১ শতাংশ ছিল পারিবারিক সহিংসতা। এসব ঘটনায় সবচেয়ে বেশি অভিযুক্ত স্বামী। এরপর বাবা, সাবেক স্বামী, ছেলে ও সৎ বাবার অবস্থান। দাম্পত্য ও পারিবারিক বিরোধ, স্বজনের আচরণ নিয়ে সন্দেহ, অর্থনৈতিক বিরোধ, প্রতিশোধ এবং পরিবারের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছিল হত্যাকাণ্ডের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে।
বিশেষজ্ঞরা মিসরে সহিংসতা বাড়ার পেছনে অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়া, মাদকাসক্তি এবং সামাজিক উত্তেজনাকে দায়ী করেছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিনের আর্থিক ও মানসিক চাপ অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক বিরোধকে সহিংসতায় রূপ দিচ্ছে।
মিসরের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সোশ্যাল অ্যান্ড ক্রিমিনাল রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, পারিবারিক হত্যাকাণ্ডে ছুরিকাঘাত ও শ্বাসরোধের ঘটনা বেশি দেখা যাচ্ছে। কৃত্রিম মাদক, বিশেষ করে ‘শাবু’ নামে পরিচিত ক্রিস্টাল মেথামফেটামিনের ব্যবহারও কিছু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সহিংসতা কমাতে দ্রুত বিচার, পারিবারিক ও মানসিক কাউন্সেলিং, সামাজিক সহায়তা বাড়ানো এবং সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে আগেভাগে শনাক্ত করার ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতার প্রচার কমানো এবং পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

