চেয়ারম্যান নিয়োগে অস্থিরতা

ইসলামী ব্যাংক থেকে টাকা তোলার হিড়িক গ্রাহকদের

অর্থনৈতিক রিপোর্টার

ইসলামী ব্যাংক থেকে টাকা তোলার হিড়িক গ্রাহকদের

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাংকটিতে ফের অস্থিরতা শুরু হয়েছে। এতে গ্রাহকদের মাঝে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিগত কয়েক দিন ধরে নিজেদের জমাকৃত আমানত তুলে নিচ্ছেন গ্রাহকরা।

ঈদুল আজহার পর প্রথম কর্মদিবস থেকে গতকাল রোববার পর্যন্ত আমানতকারীরা প্রায় তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। গতকাল ইসলামী ব্যাংকের আমানত কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ৮১ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়। ব্যাংকের শীর্ষপর্যায়ের এক কর্মকর্তা এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

বিজ্ঞাপন

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, গত ২৪ মে চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশীদ আলমের নিয়োগের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন শাখায় আমানতকারীদের ভিড় বাড়তে থাকে। এ সমস্যার সমাধান না হলে টাকা উত্তোলনের চাপ আরো বাড়তে পারে।

তিনি জানান, গত সোম থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চার কর্মদিবসে প্রায় দুই হাজার ৫৭০ কোটি টাকার মতো উত্তোলন করা হয়েছে। গতকাল রোববার প্রায় এক হাজার কোটি টাকার মতো উত্তোলন হয়েছে। এতে পাঁচ কর্মদিবসেই উত্তোলনের অঙ্ক প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা।

এ বিষয়ে জানতে ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হোসাইনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। যদিও গতকাল এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত এবং ব্যাংকে কোনো তারল্য সংকট নেই। গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় এবং বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব সময় পাশে থাকার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

গ্রাহকদের টাকা সুরক্ষিত জানিয়ে ভিডিও বার্তায় তিনি আরো বলেন, সারা দেশে কিছু গ্রাহক আতঙ্কিত হয়ে বিভিন্ন মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়ার খবরে বিভ্রান্তিতে পড়ে টাকা ওঠানোর চেষ্টা করছেন। তাদের উদ্দেশে আমার একটাই কথাÑআতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব আর্থিক ভিত্তি মজবুত এবং বড় কোনো তারল্য সংকট নেই।

গ্রাহকদের পূর্ণ নিশ্চয়তা দিয়ে তিনি বলেন, আপনাদের টাকা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত আছে। গ্রাহকরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী যখন খুশি তখন ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকেও আমরা আশ্বস্ত করতে চাই, আমরা সব সময় গ্রাহকদের পাশে আছি এবং তাদের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখতে যা কিছু করা প্রয়োজন, ইনশাল্লাহ আমরা তা করব।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) জামাল উদ্দিন মজুমদার আমার দেশকে বলেন, স্বাভাবিক অবস্থা থেকে উত্তোলন বেশি হচ্ছে। আমানতকারীদের বলব ধৈর্য ধরার জন্য। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক মিলে একটি সমাধানের দিকে যাবে বলে আশা করি।

ঈদের আগে শেষ কর্মদিবস গত ২৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। ওই দিন রাতেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

খুরশীদ আলম ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান। তিন বছরের জন্য তাকে এ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে ওই আমলে নিয়োগ পাওয়া তিনিসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন চার কর্মকর্তা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই তার নিয়োগের বিরোধিতা করে বিভিন্ন ব্যানারে কর্মসূচি পালন করে আসছেন গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডাররা। আন্দোলনকারীরা বলেন, বিতর্কিত নিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকটিকে আবার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হচ্ছে। তারা নতুন চেয়ারম্যানের পদত্যাগ, এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণকালে সংঘটিত অনিয়ম-দুর্নীতির বিচার, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং জালিয়াতির মাধ্যমে দখল করা শেয়ার বিক্রি করে ঋণ সমন্বয়সহ সাত দফা দাবি জানান।

গতকাল সকালে রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’। সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক নুর নবী মানিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুরশীদ আলমের পদত্যাগ দাবি করেন। এছাড়া আজ সোমবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কর্মকর্তাদের দেশব্যাপী দুই ঘণ্টার কলমবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানান তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন