ব্যাংক-কোম্পানি আইন অনুযায়ী তফসিলি ব্যাংকগুলোতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচ ব্যাংকে কখনোই স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। রূপালী ব্যাংকে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হলেও বর্তমানে কোনো স্বতন্ত্র পরিচালক নেই। এতে ব্যাংক কোম্পানি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হচ্ছে।
আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নিজেদের জারি করা নীতিমালাও মানা হচ্ছে না। স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বারবার জানানো হলেও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ তা আমলে নিচ্ছে না। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালক ও স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ করে থাকে। ব্যাংকগুলো ওয়েবসাইটের তথ্য বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ব্যাংকগুলো হলোÑ সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, স্বতন্ত্র পরিচালক না থাকলে ব্যাংক পরিচালনায় ঝুঁকি তৈরি হয়। কারণ স্বতন্ত্র পরিচালকদের কিছু সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব থাকে। স্বতন্ত্র পরিচালকরা শেয়ারহোল্ডারের স্বার্থ না বরং আমানতকারী ও ব্যাংকের স্বার্থ দেখবে। ফলে ব্যাংকগুলোতে স্বতন্ত্র পরিচালক না থাকলে সুশাসন নিয়ে ঝুঁকি থাকে। তাই স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ করা জরুরি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ ব্যাংকগুলোতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ করা হয়নি। এতে ব্যাংকগুলোতে ব্যাপক লুটপাট হলেও তা দেখার মতো কেউ ছিল না।
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ (সংশোধিত ২০২৩)-এর ১৫ (৯) ধারা অনুযায়ী সরকারি কিংবা বেসরকারি সবার জন্য পরিচালনা পর্ষদে প্রয়োজনীয়সংখ্যক স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের ২৮ অক্টোবর ২০২৫ এবং ২২ ডিসেম্বর ২০২২ সালের জারি করা নীতিমালায় বলা হয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ অনুসারে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ব্যাংকের পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হবে।
ব্যাংকগুলোর ওয়েবসাইটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ১০ জন সদস্য রয়েছেন। সবাই ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে আছেন। সেখানে কোনো স্বতন্ত্র পরিচালক নেই। এ ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে থেকে মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী পদত্যাগ করার পর নতুন করে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। পরিচালক মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।
ধুঁকতে থাকা জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ৯ জন সদস্য রয়েছে। এই ব্যাংকেও কোনো স্বতন্ত্র পরিচালক নেই। একই অবস্থা অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে। প্রতিটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ৭ জন পরিচালক রয়েছেন। একটিতেও স্বতন্ত্র পরিচালক নেই। এ বিষয়ে জানতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক ও অতিরিক্ত সচিব আজিমুদ্দিন বিশ্বাসকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা কেউই রিসিভ করেননি। পরবর্তী সময়ে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করা হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
জানা গেছে, ২০০৯ সাল থেকে খেয়ালখুশিমতো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে পরিচালক নিয়োগ দিয়ে আসছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। বিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাবেক সেনা কর্মকর্তা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সাবেক আমলা, সাংবাদিক, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ এর ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ, সহযোগী সংগঠন যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং বিরোধী দল জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের বিভিন্ন ব্যাংকের পর্ষদে বসানোর উদাহরণ তৈরি করা হয়েছিল।
তিন বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়া এসব পরিচালকের অনেকেরই দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং, মুদ্রানীতি ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানের অভাব ছিল বলে সমালোচনা রয়েছে। সমালোচনার পরও আওয়ামী লীগ সরকার একইভাবে একই ধরনের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়। বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর ২০০৯-১২ সময়ের অপকর্ম ধরা পড়ার পরও ২০১২ সালে তাকে দ্বিতীয় দফায় দুই বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া যার অন্যতম উদাহরণ।
তবে ২০১৪ সাল থেকে পরিচালক নিয়োগের জন্য লোক বাছাই করে ব্যাংকগুলোর পর্ষদের কাছে চিঠি পাঠানো শুরু করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। কিন্তু এর পর থেকে বেশিরভাগ নিয়োগ দেওয়া হচ্ছিল দলীয় আনুগত্য পোষণকারী সাবেক আমলাদের। সমানতালে চলতে থাকে শিক্ষকদের নিয়োগ দেওয়াও। এমন প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ একটি নীতিমালা জারি করেছে। নীতিমালাটির নাম ‘রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের শেয়ার রয়েছে এমন বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান/পরিচালক নিয়োগ নীতিমালা, ২০২৫।’এর মাধ্যমে ২০২২ সালে জারি হওয়া এ সংক্রান্ত নীতিমালা বাতিল করা হয়।
নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, ঋণখেলাপি ও করখেলাপি হলে এবং ১০ বছরের প্রশাসনিক বা ব্যবস্থাপনা বা পেশাগত অভিজ্ঞতা না থাকলে কেউই ব্যাংকের পর্ষদ সদস্য হতে পারবেন না। ফৌজদারি অপরাধ বা জালজালিয়াতি, আর্থিক অপরাধ বা অন্য কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বা আছেন, এমন কেউ পর্ষদ সদস্য হতে পারবেন না।
এ ছাড়া দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলায় আদালতের রায়ে বিরূপ পর্যবেক্ষণ বা মন্তব্য থাকলে এবং আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থার বিধিমালা, প্রবিধান বা নিয়মাচার লঙ্ঘন করে দণ্ডিত হলেও পর্ষদ সদস্য হওয়া যাবে না। একটি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক থাকতে কেউ অন্য কোনো ব্যাংকের পরিচালক হতে পারবেন না।
নীতিমালা অনুযায়ী আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের বাছাই কমিটি নাম চূড়ান্ত করবে। চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা। তবে পরিচালক নিয়োগের চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন অর্থমন্ত্রী বা অর্থ উপদেষ্টা।
নতুন নীতিমালায় সনদপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষক (সিএ), সাবেক জেলা জজ বা ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং সাবেক একজন ব্যাংকার নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, পর্ষদে এক-তৃতীয়াংশ নারী সদস্য রাখার বিষয় বিবেচনা করা হবে। এছাড়া প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ব্যাংকের পর্ষদে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

