এআই খাতের ঋণ নিয়ে উদ্বেগ, সপ্তাহজুড়ে নাসডাকের বড় পতন

এআই খাতের ঋণ নিয়ে উদ্বেগ, সপ্তাহজুড়ে নাসডাকের বড় পতন

প্রযুক্তি খাতের শেয়ারগুলোর জন্য গত সপ্তাহটি ছিল অত্যন্ত অস্থির। উচ্চ সুদের হার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) খাতে ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

বিজ্ঞাপন

গত শুক্রবার মার্কিন শেয়ারবাজারের প্রযুক্তি সূচক নাসডাক কম্পোজিট ২.১৪ শতাংশ কমেছে। এতে পুরো সপ্তাহে সূচকটির পতনের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪.৫ শতাংশে, যা গত জুনের পর সবচেয়ে খারাপ সাপ্তাহিক পারফরম্যান্স। একই সময়ে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১.০৯ শতাংশ কমেছে; এটিও জুনের পর তাদের সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক দরপতন। খবর সিএনএনের।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ১০ দিন আগেও নাসডাক এবং এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। কিন্তু এরপর থেকেই বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়। কারণ ক্রমবর্ধমান ঋণের সুদ এআই খাতের ঋণনির্ভর ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলোর ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে কি না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।

এই উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে ‘নিওক্লাউড’ নামে পরিচিত এক বিশেষ ধরনের কোম্পানি, যারা এআই খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কম্পিউটিং সক্ষমতা ভাড়া দিয়ে থাকে। এনভিডিয়া সমর্থিত এবং ২০২৫ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ‘কোরউইভ’ নামক একটি নিওক্লাউড কোম্পানি বর্তমানে বাজারের প্রধান উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কোরউইভ তাদের প্রবৃদ্ধির জন্য প্রচুর ঋণ নিয়েছে, ফলে তাদের ব্যালেন্স শিটে এখন কয়েক হাজার কোটি ডলারের ঋণের বোঝা রয়েছে। সম্প্রতি কোম্পানিটির বন্ডের ইল্ড এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা চরম আর্থিক সংকট বা খেলাপি হওয়ার উচ্চ ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। ডি. এ. ডেভিডসনের প্রযুক্তি গবেষণা বিভাগের প্রধান গিল লুরিয়া বলেন, কোরউইভ তাদের নেওয়া ঋণ পরিশোধের জন্য যথেষ্ট মুনাফা অর্জন করতে পারবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। মানুষ যখন এআই খাতের অবকাঠামো নির্মাণের গতিপথ নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন এই কোম্পানিগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অংশে অবস্থান করছে।

গত বৃহস্পতিবার এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং এই উদ্বেগ প্রশমিত করার চেষ্টা করে কোরউইভের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ফলে সেদিন কোম্পানিটির শেয়ারদর কিছুটা বাড়লেও তা ছিল ক্ষণস্থায়ী। গত শুক্রবারই শেয়ারটির দর প্রায় ১২ শতাংশ কমে যায়। চলতি সপ্তাহে কোরউইভের শেয়ারের মূল্য এক-চতুর্থাংশ কমেছে এবং গত মার্চে তালিকাভুক্তির পর সর্বোচ্চ দর থেকে এটি বর্তমানে ৬৫ শতাংশের বেশি নিচে অবস্থান করছে।

এরই মধ্যে, গত শুক্রবার তেলের দামও বেড়ে গেছে। মে মাসের পর প্রথমবারের মতো ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারে পৌঁছেছে, যা নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং ফেডারেল রিজার্ভকে সুদের হার আরও বাড়াতে বাধ্য করতে পারে।

বাজারের এই অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে সেমিকন্ডাক্টর চিপ নির্মাতাদের শেয়ারের দরপতন। এআই বিপ্লবের মূল ভিত্তি বা ‘অস্ত্র সরবরাহকারী’ হিসেবে বিবেচিত এই চিপ কোম্পানিগুলোর শেয়ার নিয়ে গঠিত সূচক গত শুক্রবার ৩.৮ শতাংশ কমেছে, যা টানা অষ্টম দিনের মতো দরপতন। পুরো সপ্তাহে এই খাতের সূচক ১১.৪ শতাংশ কমেছে, যা ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর সবচেয়ে খারাপ সাপ্তাহিক ফলাফল।

চলতি বছরের শুরুতে এআই প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তার ও চিপের ঘাটতির আশায় বিনিয়োগকারীরা এসব কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ওয়াল স্ট্রিটে এখন ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং ডেটা সেন্টার নিয়ে রাজনৈতিক জটিলতা এআই অবকাঠামো নির্মাণের পূর্বাভাসকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি, চীনা মেমোরি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিএক্সএমটি উন্নত চিপ তৈরির অগ্রগতির ঘোষণা দেওয়ায় সস্তা ও কার্যকর চিপের প্রতিযোগিতায় মার্কিন ও দক্ষিণ কোরিয়ান চিপ নির্মাতাদের আধিপত্য নিয়ে নতুন শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এর প্রভাব পড়েছে এশিয়ার বাজারেও। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান সূচক ‘কোস্পি’ এ সপ্তাহে ১৪.৫ শতাংশ কমেছে, যা ২০০৮ সালের পর থেকে তাদের সবচেয়ে খারাপ সাপ্তাহিক পারফরম্যান্স। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচকের মোট বাজার মূল্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে এই সেমিকন্ডাক্টর শিল্প থেকে, তাই এই খাতে বড় পতন পুরো শেয়ারবাজারেই বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

ওয়াল স্ট্রিটের ভয়ের পরিমাপক হিসেবে পরিচিত ‘ভিআইএক্স’ সূচকটি শুক্রবার ২০ শতাংশের বেশি বেড়ে ২০ পয়েন্ট অতিক্রম করেছে, যা বাজারে উচ্চমাত্রার অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সব মিলিয়ে, চলতি মাসের শুরুর দিকের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক প্রায় ২ শতাংশ এবং নাসডাক সূচক প্রায় ৫ শতাংশ নিচে নেমে এসেছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন