দেশের ব্যাংকিং খাত এখন এক কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে চাপ—উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ, ক্রমাগত বাড়তে থাকা মূলধনের ঘাটতি, আর সরকারের অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার কারণে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ কমে যাওয়া। এই তিনটি সমস্যার সম্মিলিত প্রভাবে পুরো আর্থিক পরিবেশই অস্থির হয়ে উঠেছে। এগুলো হঠাৎ করে তৈরি হয়নি; বরং দীর্ঘদিন ধরে সুশাসনের ঘাটতি, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং জবাবদিহির অভাব জমে জমেই আজকের এই অবস্থার সৃষ্টি করেছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৫.৭৩ শতাংশে—যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় এই হার অনেক বেশি, যা আমাদের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
এর পাশাপাশি ২০২৪ সালে ব্যাংকগুলো প্রায় ১,০৬,১৩১ কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতিতে পড়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮৬,৮৭০ কোটি টাকা বেশি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, এই খাতকে আবার শক্ত অবস্থানে আনতে হলে জিডিপির অন্তত ১০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৫.৫ থেকে ৬ লাখ কোটি টাকা পুনঃমূলধনীকরণের প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের নেওয়া ঋণ তিন গুণের বেশি বেড়ে ৫,৯৯,৪১৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে গেছে। এরই প্রতিফলন দেখা গেছে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে, যখন বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে আসে মাত্র ৬.০৩ শতাংশে—যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এই পরিস্থিতিকে শুধু ব্যাংকিং খাতের সংকট হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় অগ্রাধিকার হিসেবে নিতে হবে। তাই এখনই সময় সরকার ও নীতিনির্ধারকদের কার্যকর ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়ার। কিছু ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ দরকার, কিছু ক্ষেত্রে আইনি উদ্যোগ—কিন্তু সবকিছুর মূল শর্ত হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
প্রথমত, সম্পদ পুনরুদ্ধারের জন্য একটি শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া বা ফিলিপাইনের অভিজ্ঞতা দেখায়—শুধু নীতিমালা থাকলেই হয় না, সঠিক বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য একটি সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন, অর্থ আদালতের কার্যক্রম দ্রুত করা, দেউলিয়া আইন আধুনিক করা এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াকে কার্যকর করতে ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন।
এই প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে প্রভিশনের ওপর পূর্ণ কর রেয়াত দেওয়া উচিত। এতে ব্যাংকগুলো অনাদায়ী আয় লুকানোর বদলে স্বচ্ছভাবে দেখাতে উৎসাহিত হবে, যা শেষ পর্যন্ত আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়াবে।
দ্বিতীয়ত, জামানত ও বন্ধকী ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার দরকার। জমি, ফ্ল্যাট, যন্ত্রপাতি, পণ্য, পাওনা অর্থ ও শেয়ার—সবকিছুকে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এনে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করতে হবে। এটি ভূমি রেকর্ড, এনআইডি, আরজেএসসি ও ক্রেডিট সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এই কাজের জন্য প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রয়োজন। এতে একই সম্পদ একাধিকবার বন্ধক রাখা বন্ধ হবে এবং ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সহজে ঋণ পাবে।
তৃতীয়ত, ব্যাংকগুলোর পুনঃমূলধন জোগান এখন সময়ের দাবি। এটি আসতে পারে শেয়ারহোল্ডার, কৌশলগত বিনিয়োগকারী এবং অন্যান্য উৎস থেকে। পাশাপাশি, রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বছরে ৫০,০০০ থেকে ৮০,০০০ কোটি টাকা রাখা যেতে পারে, তবে তা কঠোর সংস্কারের শর্তে দিতে হবে—যাতে অতীতের মতো জবাবদিহিহীন সহায়তা না হয়।
এর সঙ্গে ব্যাংকের কর হার কমিয়ে ৩৭.৫-৪২.৫ শতাংশ থেকে ২৮-৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা উচিত। এতে আন্তর্জাতিক মান বজায় থাকবে এবং ব্যাংকগুলো আরও বেশি ঋণ দিতে পারবে, যা শিল্প ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
চতুর্থত, ব্যাংকিং খাতকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। এজন্য এমএসএমই খাতে বিশেষ ঋণ কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে ১০,০০০ থেকে ১৫,৫০০ কোটি টাকার ক্রেডিট গ্যারান্টি থাকবে। পাশাপাশি ৪,০০০-৬,০০০ কোটি টাকার সুদ ভর্তুকি এবং টেক্সটাইল খাতের আধুনিকায়নে ১৫,০০০-২০,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা যেতে পারে।
ভারতের পিএলআই স্কিম বা তামিলনাড়ুর টেক্সটাইল উদ্যোগ দেখিয়েছে, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এই ধরনের উদ্যোগ বড় আকারে কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। তবে এই অর্থ সরাসরি অনুদান না দিয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে দেওয়া হলে স্বচ্ছতা বজায় থাকবে।
পঞ্চমত, ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়া কমাতে হবে। ২০২০ সালে যেখানে এই হার ছিল ৩২.১ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫.৩ শতাংশে। এই অবস্থায় ব্যাংকগুলোকে আবার বেসরকারি খাতে ঋণ বাড়াতে বলা বাস্তবসম্মত নয়। তাই ধীরে ধীরে এই হার ৩০ শতাংশের নিচে নামাতে হবে। এজন্য রাজস্ব বাড়ানো, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বন্ড বাজার উন্নয়ন জরুরি।
ষষ্ঠত, কর আদায়ে ব্যাংকের ভূমিকা বাড়ানো দরকার। বর্তমানে কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে, যা খুবই কম। ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে কর ব্যবস্থাকে ডিজিটালি যুক্ত করতে ২,০০০-৩,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করলে রাজস্ব আদায় বাড়বে এবং সরকারের ঋণ নির্ভরতা কমবে।
সপ্তমত, একটি ক্যাশলেস অর্থনীতির দিকে এগোতে হবে। জাতীয় কিউআর কোড, মার্চেন্ট অনবোর্ডিং, গ্রামীণ নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে একটি আধুনিক পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ২,৫০০-৪,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ দরকার।
এখানে শুধু অর্থ নয়, নীতিগত সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংককে আগামী ১৮ মাসের মধ্যে সব মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস ও ব্যাংকের মধ্যে আন্তঃলেনদেন বাধ্যতামূলক করতে হবে। ভারতের ইউপিআই বা ব্রাজিলের পিক্স দেখিয়েছে, সঠিক উদ্যোগ নিলে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।
সবশেষে, এই সব উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর স্বাধীনতার ওপর। একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ব্যাংকই মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে।
সময় এখনই। দেরি হলে ক্ষতি আরও বাড়বে। তাই আসুন, এখনই পদক্ষেপ নিই—নইলে পতন ঠেকানো কঠিন হয়ে যাবে।
লেখক ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যন
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

