পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২৪১ নেতাকর্মীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত, এখনো নিখোঁজ সাত নেতাকর্মীর সন্ধান এবং গুম ও হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তেরও দাবি জানিয়েছে তারা।
রোববার আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে আয়োজিত ‘গুম ও নিপীড়নের খতিয়ান: ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ ও গুম প্রতিরোধে কার্যকর সংস্কারের দাবি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের গুম, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয় এবং এখনও নিখোঁজ সাত নেতাকর্মীর সন্ধান ও গুমের ঘটনায় জড়িতদের বিচারের দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, রাষ্ট্রীয় গুমের শিকার হয়ে ছাত্রশিবিরের সাতজন মেধাবী নেতাকর্মী এখনো নিখোঁজ। তারা হলেন- ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. ওয়ালীউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাস, ঢাকা ডেন্টাল কলেজের হাফেজ জাকির হোসেন, বেনাপোলের রেজওয়ান হোসেন, বান্দরবানের জয়নাল হোসেন, ঝিনাইদহের মু. কামরুজ্জামান এবং কক্সবাজারের শফিকুল ইসলাম।
তার দাবি, এক যুগেরও বেশি সময় পার হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এদের কারও আটকের কথা স্বীকার করেনি। ফলে পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তা ও যন্ত্রণার মধ্যে রয়েছে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে কুষ্টিয়াগামী বাসে করে ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে আশুলিয়ার নবীনগর থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন অর্থ সম্পাদক মো. ওয়ালীউল্লাহ ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক আল মুকাদ্দাসকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে গ্রেপ্তার করে গুম করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৩ সালের ২ এপ্রিল দিবাগত রাতে ঢাকার শ্যামলী রিং রোডের টিক্কাপাড়ার বাসা থেকে সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ছাত্রশিবিরের আদাবর থানা সভাপতি হাফেজ জাকির হোসেনকে তুলে নিয়ে যান বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
এ ছাড়া ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট বেনাপোল পোর্টসংলগ্ন দুর্গাপুর বাজার থেকে রেজওয়ান হোসেন, একই বছরের ২৩ অক্টোবর বান্দরবান সদর থেকে জয়নাল হোসেন, ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল ঝিনাইদহের লেবুতলা থেকে মু. কামরুজ্জামান এবং ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে শফিকুল ইসলামকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয় বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়।
নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, গুম বিষয়ক তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি গুমের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ছাত্রশিবিরের ২৪১ জন রয়েছেন, যা রাজনৈতিক পরিচয় থাকা মোট ভুক্তভোগীর ২৫ দশমিক ৪২ শতাংশ বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, কমিশনে আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল করা তথ্যের বাইরে আরও অনেক ঘটনা রয়েছে। নিরাপত্তাহীনতা, ভয়, নির্যাতনের কারণে মানসিক বিপর্যয় এবং দেশের বাইরে অবস্থানের কারণে অনেকে কমিশনে অভিযোগ করতে পারেননি। ফলে ছাত্রশিবিরের প্রকৃত গুমের সংখ্যা সাত শতাধিক বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক ক্ষেত্রে আটকের বিষয়টি স্বীকার করেনি। এতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারগুলো বছরের পর বছর তাদের স্বজনদের ভাগ্য সম্পর্কে অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকেছে।
সংবাদ সম্মেলনে গুমের পর ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ হত্যারও অভিযোগ তুলে ধরা হয়। সাদ্দাম বলেন, অনেককে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর নির্যাতন করা হয়েছে এবং পরে কথিত ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে তিনি ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী মাইদুল ইসলাম ও ইবনুল ইসলাম পারভেজসহ কয়েকজনের ঘটনা তুলে ধরেন। তার দাবি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাইদুল ইসলাম ও ছাত্রদল নেতা আতিকুর রহমানকে ২০১৪ সালের ১৩ জানুয়ারি ডিবি তুলে নেয়। পরে আতিকুর রহমানের লাশ পাওয়া যায় এবং মাইদুলকে হত্যার পর বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়। পরিবার প্রায় ৫০ দিন পর এ বিষয়ে জানতে পারে বলে তিনি দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত মাইদুল ইসলামের ভাই শহিদুল ইসলাম বলেন, তার ভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাকে গুম করে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তার ভাষ্য, মাইদুলের মৃত্যুর পর বাবা-মা দুজনেই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং শোক কাটিয়ে উঠতে না পেরে তার মা কিছুদিন পর মারা যান।
লিখিত বক্তব্যে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের হাতে সংগঠনটির অন্তত ১০১ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি ঘটনার উদাহরণও দেওয়া হয়। এর মধ্যে আব্দুল্লাহ ওমর নাসিফকে ২০১৩ সালের ৪ মে মিরপুর থেকে র্যাব-২ তুলে নিয়ে যাওয়ার পর ১২ মে রাজশাহীতে কথিত ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয় বলে দাবি করা হয়।
এ ছাড়া ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী সাহিত্য সম্পাদক ইবনুল ইসলাম পারভেজকে ২০১৬ সালের ১৬ জুন সাদা পোশাকে তুলে নেওয়ার পর নির্যাতন করা হয় এবং ২ জুলাই ঝিনাইদহে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করা হয় বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়।
২০১৬ সালের বিভিন্ন সময়ে আবুজর গিফারী, শামীম মাহমুদ, হাফেজ মো. জসিম উদ্দীন জিহাদ, মহিউদ্দিন সোহান ও সাইফুল ইসলাম মামুনসহ আরও কয়েকজনকে তুলে নেওয়া ও পরবর্তী সময়ে হত্যার অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
গুম ও হত্যার পাশাপাশি শারীরিক নির্যাতনেরও অভিযোগ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হয়ে সংগঠনটির অনেক নেতাকর্মী স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।
এক্ষেত্রে জয়পুরহাট জেলা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি আবু জর গিফারী ও সেক্রেটারি ওমর আলীর ঘটনা তুলে ধরা হয়। ২০১৫ সালের ৮ ডিসেম্বর র্যাব তাদের তুলে নেওয়ার পর বিভিন্ন ক্যাম্পে নির্যাতন এবং পরে পায়ে গুলি করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়। চিকিৎসায় অবহেলার কারণে তাদের পা কেটে ফেলতে হয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়।
ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিগত সময়ে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১৪ হাজার ৮২৬টি রাজনৈতিক ও ‘মিথ্যা’ মামলা করা হয়েছিল। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলে দাবি করেন তারা।
সংগঠনটির অভিযোগ, সাধারণ মেস, কোরআন ক্লাস, পাঠচক্র কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস থেকেও নেতাকর্মীদের তুলে নেওয়া হতো। পরে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হতো। সাধারণ ইসলামী বই ও কোরআন-হাদিসের বইকে ‘জিহাদি বই’ হিসেবে উপস্থাপন করে নেতাকর্মীদের জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হতো বলেও অভিযোগ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেনের প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়। সংগঠনটির দাবি, ২০১৩ সালে তাকে গ্রেপ্তারের পর বিভিন্ন মামলায় ধারাবাহিকভাবে ৫৭ দিন রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, গুমের পর ছাত্রশিবির ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো স্থানীয় থানা ও র্যাব কার্যালয়ে বারবার যোগাযোগ করেছে। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট, তৎকালীন সরকারের পতনের পরদিন, গুম হওয়া নেতাকর্মীদের পরিবার র্যাব সদর দপ্তরে গিয়ে তাদের সন্ধান দাবি করে। তবে সেখানে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়।
পরে ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর ওয়ালীউল্লাহ, মুকাদ্দাস, জাকির হোসেন, জয়নাল আবেদীন, রেজওয়ান হুসাইন ও কামরুজ্জামানের পরিবারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে র্যাব ও ডিবির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ করা হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। একই বছরের ১৭ নভেম্বর আরও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করা হয়।
প্রস্তাবিত গুমবিরোধী আইন নিয়ে উদ্বেগ
সংবাদ সম্মেলনে প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন’ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে বলা হয়, গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধেই যদি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
তাদের দাবি, তদন্তের দায়িত্ব এমন একটি স্বাধীন সংস্থার হাতে দিতে হবে, যার ওপর অভিযুক্ত কোনো বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব থাকবে না। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে নিজস্ব তদন্ত দল ও কার্যকর ক্ষমতা দেওয়ারও দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- গুম কমিশনে দায়ের করা ২৩৬ জন ছাত্রশিবির নেতাকর্মীসহ সাত শতাধিক গুমের ঘটনার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, এখনো নিখোঁজ সাত নেতাকর্মীর অবস্থান সম্পর্কে রাষ্ট্রের স্পষ্ট বক্তব্য, গুম ও হত্যার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিচার, ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনসহ সংশ্লিষ্ট আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধন।
এ ছাড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে তদন্তের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রশিবিরের নেতারা বলেন, নিখোঁজ সাত নেতাকর্মীর পরিবার এখনো তাদের স্বজনদের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছে। তাদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান জানানো এবং গুমের ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

