উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের কৃষিকে আধুনিক, বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিনির্ভর খাতে রূপান্তরের লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয়ের পার্টনার প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কৃষককে ডিজিটাল সেবার আওতায় আনা, উত্তম কৃষি চর্চা, নিরাপদ খাদ্য, গবেষণা, কৃষিপণ্য রপ্তানি ও জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি বিস্তারে কাজ করছে প্রকল্পটি।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার) প্রকল্পটির নির্ধারিত ফলাফলের বিপরীতে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় ৪৭ শতাংশ সার্বিক অগ্রগতি হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির মোট ব্যয় প্রায় ছয় হাজার ৯১১ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত এ প্রকল্পে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরসহ সাতটি সরকারি সংস্থা যুক্ত রয়েছে। দেশের ১৪টি কৃষি অঞ্চলের ৬৪ জেলা ও ৪৯৫ উপজেলায় প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় ২৮ হাজার ৫৯৭টি মাঠ স্কুল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০টির কার্যক্রম চলছে। কৃষকদের উত্তম কৃষি চর্চা বিষয়ে প্রশিক্ষণের ২০ হাজার ব্যাচের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার হাজার সম্পন্ন হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে ৩০টি প্রশিক্ষণ ব্যাচের মধ্যে ২৭টি শেষ হয়েছে। জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের ১১২টি কর্মশালার মধ্যে ৩১টি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রকল্পের অন্যতম বড় উদ্যোগ কৃষক কার্ড। চলতি আগস্টে ১০ লাখ এবং এ বছরের মধ্যে ৪৭ লাখ কৃষককে কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে প্রায় ১৪ লাখ কৃষকের তথ্যভাণ্ডার প্রস্তুত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষককে এ কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষকদের ভর্তুকি, ঋণ, প্রণোদনা ও অন্যান্য সরকারি সুবিধা সহজে পৌঁছে দিতে কৃষক কার্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সোনালী, জনতা ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে কৃষকদের আন্তর্জাতিক ডেবিট কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ বিষয়ে পার্টনার প্রকল্পের কোর্ডিনেটর আবুল কালাম আজাদ বলেন, কৃষি খাতের আধুনিকায়ন ও রূপান্তরের লক্ষ্যে বাস্তবায়নাধীন পার্টনার প্রকল্পের অগ্রগতি শুধু ব্যয়ের হার দিয়ে মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ভিত্তিতেই এ প্রকল্পের অগ্রগতি বিবেচনা করা হয়। সেই হিসেবে গত জুন পর্যন্ত প্রকল্পের সামগ্রিক অগ্রগতি প্রায় ৪৭ শতাংশ।
তিনি বলেন, পার্টনার প্রকল্পের অর্থায়ন পদ্ধতি ফলাফলভিত্তিক। বাংলাদেশের কৃষি খাতে এ ধরনের অর্থায়ন পদ্ধতির প্রকল্প আগে বাস্তবায়িত হয়নি। উন্নয়ন সহযোগীদের নির্ধারিত ফলাফল অর্জনের প্রমাণ যাচাইয়ের পরই অর্থ ছাড় করা হয়।
২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ও ইফাদের ঋণ চুক্তির পরিমাণ ৫৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পের ক্রমপুঞ্জীভূত ফলাফলের বিপরীতে ২৫২ দশমিক ৭১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়ের জন্য দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ চুক্তির মোট অর্থের প্রায় ৪৭ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থের দাবি উত্থাপিত হয়েছে।
কোর্ডিনেটর আবুল কালাম বলেন, প্রকল্পে মোট ১০টি অর্থ ছাড়ের সংযোগ নির্দেশকের আওতায় ২৪টি ফলাফলভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জনের প্রমাণপত্র প্রকল্প থেকে দাখিল করা হয়। পরে একটি স্বাধীন যাচাইকারী সংস্থা তা যাচাই করে। যাচাই শেষে নির্ধারিত হারে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থ ছাড় হয়। তবে কিছু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) সংশোধন করা প্রয়োজন।
এর মধ্যে অন্যতম হলো কৃষক কার্ডের মাধ্যমে ৫০ লাখ কৃষকের কাছে ডিজিটাল কৃষিসেবা পৌঁছে দেওয়া। এছাড়া উত্তম কৃষিচর্চার আওতায় তিন লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ১০ লাখ কৃষক ও খামারকে সনদের আওতায় আনা, স্বীকৃত পরীক্ষাগার স্থাপন এবং নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজেট প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে ১০ শতাংশ হারে বাড়ানোর মতো লক্ষ্যমাত্রাও রয়েছে।
তিনি বলেন, গত ১ থেকে ২৩ জুন বিশ্বব্যাংক ও ইফাদের যৌথ মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনা মিশনে এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হয়েছে। সেখানে ডিপিপি সংশোধনের পাশাপাশি কিছু লক্ষ্যমাত্রা পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।
কোর্ডিনেটর জানান, উন্নয়ন সহযোগীদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বাইরে থাকা অন্যান্য কার্যক্রম, বিশেষ করে অবকাঠামো ও ভৌত নির্মাণকাজ, ডিপিপি সংশোধন ছাড়া শুরু করা সম্ভব নয়। সংশোধনের প্রক্রিয়া বর্তমানে চলছে। সংশোধন ছাড়া প্রকল্পের অর্থ ব্যয় করলে পরবর্তী সময়ে অর্থ ছাড় নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ডিপিপি সংশোধন সম্পন্ন হলে প্রকল্পের অন্যান্য কার্যক্রমও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন




