‘অন্যবারের তুলনায় এবার ঝড় কম হয়েছে, পোকার সমস্যা কিছুটা ভুগিয়েছে, তবে সব মিলিয়ে ফলন ভালোই। আজকে ১৫ ক্যারেট গোবিন্দভোগ আম বাজারে দিলাম ১ হাজার ৯০০ টাকা মণ করে।’
এভাবেই বলছিলেন, সাতক্ষীরার কলারোয়া এলাকার আম চাষি খান নাজমুস সাদাত। তিনি জানান, মৌসুমের শুরুতেই ধরণ ভেদে ১ হাজার ৯০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় আম বিক্রি হয়েছে সাতক্ষীরায়।
মধুমাস হিসেবে পরিচিত জ্যৈষ্ঠ মাস শুরু না হতেই বাজারে আসতে শুরু করেছে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলবর্তী জেলা সাতক্ষীরার আম।
কৃষি বিভাগের 'ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার' হিসেবে এই জেলার আম-ই সব থেকে আগে বাজারে আসছে।
সাধারণত সাতক্ষীরা বললেই সুন্দরবন কিংবা দিগন্তজোড়া চিংড়ি ঘের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিন্তু গত এক দশকে এই পরিচিতি বদলে দিয়েছে এখানকার আম। গ্রীষ্মের সুস্বাদু এই ফল উৎপাদনে রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর সুনাম থাকলেও গত এক দশকে এই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে সাতক্ষীরাও।
কৃষি গবেষকরা বলছেন, উত্তরবঙ্গের চিরাচরিত আমের সাম্রাজ্যে ভাগ বসিয়ে সাতক্ষীরা এখন দেশের আম অর্থনীতির নতুন এক উৎস।
ভালো স্বাদের পাশাপাশি মৌসুমের শুরুতে সবচেয়ে আগে সাতক্ষীরার আম বাজারে আসার বিষয়টি এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে বলেই মনে করেন তারা।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জেলায় আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭০ হাজার টন।
চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা থেকে ১০০ টন আম বিদেশে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম।
জেলা প্রশাসনের ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, এ বছর গোবিন্দভোগ আম সংগ্রহের মধ্য দিয়ে সাতক্ষীরায় আমের মৌসুম শুরু হয়েছে।
এরপর হিমসাগর ও ল্যাংড়া আম বাজারে আসবে। আর জুনের শুরুতে সংগ্রহ করা হবে আম্রপালি জাতের আম।
একইভাবে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে আম পাড়া শুরু হবে আগামী ১৫ মে থেকে।
সাতক্ষীরার আম কেন আগে বাজারে আসে?
সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের 'ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার' অনুযায়ী মঙ্গলবার (৫ মে) থেকে শুরু হয়েছে গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ আম সংগ্রহের কাজ। এরপর ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য জাতের আম সংগ্রহ করা হবে।
কয়েকদিনের মধ্যেই সাতক্ষীরার আম দেশের সব প্রান্তে পৌঁছে যাবে বলে জানান স্থানীয় আম ব্যবসায়ী মোহম্মদ শাহারুল ইসলাম রাজ।
উত্তরবঙ্গের আম পাকতে যখন আরো সপ্তাহখানেক বাকি, তখন বৈশাখ মাস শেষ না হতেই সবার আগে কিভাবে সাতক্ষীরার আম বাজারে আসে, এমন প্রশ্ন রয়েছে অনেকের মনেই।
এর পেছনে ভৌগলিক নানা কারণ রয়েছে বলেই মনে করেন কৃষি গবেষকরা।
আঞ্চলিক উদ্যান তত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন বলছেন,‘প্রতি ডিগ্রি অক্ষাংশ বৃদ্ধির জন্য আমের সংগ্রহকাল তিন দিন পিছিয়ে যায়।’
তিনি বলেন, দেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী সাতক্ষীরা এলাকা ২২ দশমিক ৬০ ডিগ্রি অক্ষাংশে অবস্থিত এবং উত্তরের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের অবস্থান ২৪ দশমিক ৫৬ ডিগ্রি অক্ষাংশে।
সেই হিসাবে প্রতি ডিগ্রি অক্ষাংশের পরিবর্তনে সাতক্ষীরা এলাকা থেকে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের সংগ্রহকাল অন্তত ছয় থেকে সাতদিন পরে শুরু হয়। যা পঞ্চগড় এলাকায় আরো কিছুটা পিছিয়ে যায়।
তিনি আরো বলেন, ‘একই জাতের আম সাতক্ষীরায় যেটা আজকে হারভেস্ট হবে ওইসব এলাকায় অবস্থান ভেদে এক সপ্তাহ থেকে দুই সপ্তাহ পরে শুরু হবে।’
বিশ্বজুড়েই আম উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই নিয়মটি একইরকম বলে জানান এই গবেষক। অর্থাৎ অক্ষাংশ যত বাড়বে আমের সংগ্রহকাল ততো পিছিয়ে যাবে।
এছাড়া আমের মুকুল আসা এবং ফোঁটার ক্ষেত্রে তাপমাত্রা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘মুকুলটা যখন আসে তখন থেকে এটা ফুটতে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ দিন সময় লাগে। কিন্তু যদি তাপমাত্রা বেশি হয় তাহলে মুকুল কিছুটা আগেভাগেই ফুটে যায়। সাতক্ষীরার উপকূলবর্তী এলাকায় তাপমাত্রা বেশি থাকায় অন্য এলাকার তুলনায় আম আগেই পরিপক্ব হয়।’
সাতক্ষীরার আম আগেভাগেই আমের পরিপক্বতা আসার ক্ষেত্রে মাটির লবণাক্ততাও একটি কারণ বলে মনে করেন জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম।
তিনি বলেন, কেবল আম নয় সাতক্ষীরা এলাকায় লবণাক্ততার কারণে ধানের ক্ষেত্রেও জীবনকাল কিছুটা কম। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের কিছুটা আগেই পরিপক্বতা লাভ করে। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে সাতক্ষীরায় আমের মুকুলও আগাম আসে পরিপক্বতাও আগাম আসে। এছাড়া মাটিতে লবণ থাকার কারণে যেকোনো জিনিসের বয়স কমিয়ে দেয়।’
স্বাদে কোনো তফাৎ থাকে?
কেমিক্যাল ব্যবহার করে আগেভাগেই ফল পাকানোর অভিযোগ বাংলাদেশে নতুন নয়। আর এ কারণেই ফল খাওয়া নিয়েও বেশ শঙ্কায় থাকেন অনেকে।
বিশেষ করে মৌসুম শুরুর দিকে কোনো ফল বাজারে দেখলে তার প্রতি এক ধরনের আস্থাহীনতাও যেমন কাজ করে তেমনি আগেভাগেই বাজারে আসা ফল অপরিপক্ব কি-না অথবা সঠিক স্বাদ পাওয়া যাবে কি-না- এসব নিয়েও নানা প্রশ্ন থাকে অনেকের।
কৃষি গবেষক ড. মো. শরফ উদ্দিন বলেন, সাতক্ষীরার আম ভৌগলিক অবস্থান এবং আবহাওয়াগত কারণেই অন্যান্য এলাকার তুলনায় কিছুটা আগেভাগে বাজারে আসে। এর সঙ্গে স্বাদ কম-বেশি হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি বলেন, ‘একই জাতের আম সাতক্ষীরা এবং রাজশাহী অঞ্চলে স্বাদের ক্ষেত্রে খুব বেশি পার্থক্য থাকে না, ঊনিশ-বিশ হতে পারে।’
তবে বৃষ্টির প্রভাব কম থাকলে আমের আকারে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে বলেই মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, রাজশাহী বা চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে এই সময় অধিক খরা হওয়ায় মাটিতে রসের ঘাটতি তৈরি হয় যার ফলে শুষ্ক আবহাওয়ায় আমের আকার কিছুটা বড় হয়। এখন যে বৃষ্টি হচ্ছে এটা আমের পরিপক্ব হওয়ার জন্য সহায়ক, কিন্তু এই বৃষ্টি যদি আরো আট-১০ দিন চলে তাহলে সেটা আমের জন্য ক্ষতিকর।’
আমের জাত এবং মাটির গুণ ভেদে স্বাদের কিছুটা তফাৎ তৈরি হয় বলে জানান কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সাতক্ষীরার হিমসাগর আর চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরসাপাত একই আম। কিন্তু তাপমাত্রা ও মাটিতে লবণ থাকার কারণে সাতক্ষীরার আমের মিষ্টতা কিছুটা বেশি, কারণ ড্রাই মেটারের পরিমাণ এই আমে কিছুটা বেশি থাকে।’
সাতক্ষীরার আম এখন আর শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেই নয় যাচ্ছে বিদেশেও।
কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিষমুক্ত চাষাবাদ পদ্ধতি অনুসরণের ফলে এখানকার আম এখন ইউরোপের চেইন শপগুলোতেও জায়গা করে নিয়েছে। এর ফলে এই জেলায় প্রতি বছর আম ব্যবসার পরিধি বাড়ছে।
স্থানীয় আম ব্যবসায়ী মোহম্মদ শাহারুল ইসলাম রাজ জানান, লবণাক্ততা পানির কারণে কৃষিতে অনিশ্চয়তা থাকায় সাতক্ষীরার অনেক কৃষকই এখন আম চাষের দিকে ঝুঁকেছেন।
জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় চার হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে প্রায় ১২ হাজার ৩০০ চাষি আমের চাষ করেছেন।
এ বছর অন্তত ১০০ টন আম বিদেশে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


