আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ব্যবসায়ীদের এক হাত নিলেন গভর্নর

অর্থনৈতিক রিপোর্টার

ব্যবসায়ীদের এক হাত নিলেন গভর্নর

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যবসায়ীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো পাপেটের (পুতুল) মতো আচরণ করেছে। আপনারা ঠিক হলে দেশের অর্থনীতিও ঠিক হবে। গত সরকারের সময় যখন ৬ থেকে ৯ শতাংশ সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো তালি দিয়েছিল। অর্থ পাচারের সময়েও তারা চুপ ছিল। এমন আচরণ করলে গণতন্ত্র কখনো শক্তিশালী হয় না।

মঙ্গলবার ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশ (আইসিসি) আয়োজিত ‘ইমপ্লিকেশনস অব এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ফর ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি: বাংলাদেশ পার্সপেকটিভ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন। আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ী নেতা ও ব্যাংকাররা বক্তব্য দেন। ব্যবসায়ীরা এলডিসি থেকে উত্তরণের সময় পিছিয়ে দেওয়ার পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরেন।

বিজ্ঞাপন

গভর্নর বলেন, আমাদের অর্থনীতির প্রতিটি খাতে নিজেদের প্রস্তুত করা প্রয়োজন। আমি বাংলাদেশকে আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোর কাতারে মনে করি না। বাংলাদেশ এখন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা ভারতের মতো দেশগুলোর সমমর্যাদার দাবিদার।

তিনি বলেন, এলডিসি থেকে আজ হোক বা কাল হোক—আমাদের উত্তরণ হতেই হবে। তাই মানবসম্পদ উন্নয়ন, মুদ্রা ও আর্থিক ব্যবস্থার জন্য নির্দিষ্ট নীতিমালার প্রয়োজন। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কেবল নীতি থাকলেই হবে না, দক্ষতাও বাড়াতে হবে। লজিস্টিক সিস্টেম, নেটওয়ার্ক, যোগাযোগ, আইসিটি ও শিক্ষা—সব ক্ষেত্রেই উন্নয়ন প্রয়োজন। উন্নত স্বাস্থ্যসেবাও এই উত্তরণ প্রক্রিয়ার একটি বড় অংশ। ছোট সুবিধার জন্য বড় সুবিধা হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।

হা-মীম গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ বলেন, শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করলেই দেশে মূল্যস্ফীতি কমবে না। কারণ, এটি রাজস্বসহ আরও বহু বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মুদ্রানীতি কঠোর করার কারণে ইতোমধ্যে ১২ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। আগামী ছয় মাসে আরও ১২ লাখ মানুষ চাকরি হারাতে পারেন। বেসরকারি খাত ব্যাংক থেকে মাত্র ৬ শতাংশ ঋণ নিয়েছে, যেখানে সরকার নিয়েছে ২৭ শতাংশ, যা ভবিষ্যতে ৩২ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ছাড়া শুধুমাত্র মনিটারি পলিসির মাধ্যমে অর্থনীতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। বর্তমান সরকারকে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রভাব সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা করা হলেও তারা এতে একমত হননি। নতুন সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গেই এসব সমস্যার কথা তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। তা না হলে বিষয়গুলো বুঝতে তাদের অনেক সময় লেগে যাবে।

পরে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আহসান এইচ মনসুর বলেন, সুদের হার বেশি—এ কথা আমি নিজেও স্বীকার করি। তবে ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে এক অঙ্কের সুদের হার খুবই বিরল ছিল। ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার বেরিয়ে গেছে। এতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ফলে সংকোচন হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। তবুও বর্তমানে আমানত প্রবৃদ্ধি ঘুরে দাঁড়িয়েছে—যা আগে ৬ শতাংশে নেমে গিয়েছিল, এখন তা বেড়ে ১১ শতাংশে উঠেছে। এর প্রভাব পড়েছে সুদের হারে। সুশাসন, তদারকি ও গ্রাহক আস্থা বাড়লে সুদের হার কমে আসবে। এ জন্য খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। তখন মূল্যস্ফীতিও কমে আসবে।

ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যক্রমে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমরা এই সরকারের কাছে একাধিক আইন পাঠিয়েছি। এর মধ্যে ব্যাংক রেজুলেশন অর্ডিন্যান্স এবং ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স অর্ডিন্যান্স ইতোমধ্যে পাস হয়েছে। এসব আইনের মাধ্যমে পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করা হয়েছে এবং নয়টি এনবিএফআইকে অবসায়নের দিকে নেওয়া হচ্ছে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার অর্থ মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। প্রায় চার মাস আগে এটি পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত সেখানে কোনো অগ্রগতি হয়নি, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

তিনি আরো বলেন, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করার জন্য এই আইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যখন ব্যাংক খাতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে চাই, তখন কিছু প্রতিপক্ষ গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী মহল এসব সংস্কার কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। দেশকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে এসব শক্তিকে প্রতিহত করতে হবে। অন্যথায় আমাদের আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...