অপরাধ প্রমাণ হয়নি, তবু ৬ বছর জেলে ভারতের মুসলিম ছাত্র নেতা উমর খালিদ

অপরাধ প্রমাণ হয়নি, তবু ৬ বছর জেলে ভারতের মুসলিম ছাত্র নেতা উমর খালিদ

ভারতের স্বাধীনতা দিবস ঘিরে যখন স্বাধীনতার অর্জন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তখন দিল্লির তিহার কারাগারে প্রায় ৬ বছর ধরে বন্দি সাবেক জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় (জেএনইউ) শিক্ষার্থী নেতা উমর খালিদের মামলা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে গ্রেপ্তারের পর থেকে তিনি এখনো কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হননি; এমনকি মূল মামলার বিচারপ্রক্রিয়াও এখনো শুরু পর্যায়ে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

উমর খালিদ দিল্লির ২০২০ সালের দাঙ্গাকে ঘিরে করা ‘বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’ মামলায় বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন বা ইউএপিএসহ বিভিন্ন ধারায় অভিযুক্ত। তার বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, দাঙ্গা ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা উসকে দেওয়ার মতো অভিযোগও আনা হয়েছে।

দিল্লি পুলিশের অভিযোগ, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) বিরোধী আন্দোলনের সময় খালিদসহ কয়েকজন পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা উসকে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির দাঙ্গায় ৫৩ জন নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই ছিলেন মুসলিম। পুলিশের দাবি, তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফরের সময় সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ ছিলেন খালিদ।

তবে শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন উমর খালিদ। তার দাবি, দাঙ্গার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং অন্য অভিযুক্তদের সঙ্গে কোনো ষড়যন্ত্রেও তিনি যুক্ত ছিলেন না। তার সমর্থকদের ভাষ্য, মামলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ও ভিডিও নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

জামিনের পথেও দীর্ঘসূত্রতা

খালিদের মামলায় সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি করেছে দীর্ঘ সময় ধরে বিচারপূর্ব আটক থাকা। ইউএপিএর ৪৩ডি(৫) ধারায় জামিন পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত রয়েছে। আদালতকে প্রাথমিকভাবে সন্তুষ্ট হতে হয় যে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি নেই—যা সাধারণ ফৌজদারি মামলায় জামিনের প্রচলিত নীতির তুলনায় অনেক কঠিন।

২০২২ সালের অক্টোবরে দিল্লি হাইকোর্ট খালিদের জামিন আবেদন খারিজ করেন। এরপর তিনি সুপ্রিম কোর্টে যান। সেখানে শুনানি দীর্ঘ সময় ধরে এগোয়নি। বিভিন্ন কারণে এক বছরেরও বেশি সময় পর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি সেই আবেদন প্রত্যাহার করে নিম্ন আদালতে নতুন করে জামিনের আবেদন করেন। সেখানেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি।

২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট একই মামলার পাঁচ অভিযুক্ত—গুলফিশা ফাতিমা, মীরান হায়দার, শিফা উর রহমান, মোহাম্মদ সেলিম খান ও শাদাব আহমদকে জামিন দেন। তবে উমর খালিদ ও আরেক কর্মী শরজিল ইমাম জামিন পাননি। আদালত তাদের অবস্থান অন্য অভিযুক্তদের তুলনায় ভিন্ন বলে উল্লেখ করেন।

এরপর দীর্ঘ বিচারপূর্ব আটক নিয়ে নিম্ন আদালতগুলো কীভাবে আইনি নজির প্রয়োগ করছে, তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আরেকটি বেঞ্চ প্রশ্ন তোলে। সেই সুযোগে খালিদ ও শরজিল ইমাম নতুন করে জামিনের চেষ্টা করেন। কিন্তু ২০২৬ সালের জুলাইয়ে তাদের জানানো হয়, জানুয়ারির সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের কারণে ট্রায়াল কোর্ট ওই সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারবে না।

বর্তমানে খালিদ আবারো দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। এটি তার অষ্টম দফা জামিন আবেদন বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। পুলিশের জবাব চাওয়া হয়েছে এবং আগস্টের শেষ দিকে এ বিষয়ে শুনানির কথা রয়েছে।

‘বিচারের আগে শাস্তি’ নিয়ে প্রশ্ন

খালিদের মামলাকে কেন্দ্র করে নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলো মূলত একটি প্রশ্ন তুলছে—একজন অভিযুক্তকে বছরের পর বছর বিচার ছাড়াই কারাগারে রাখা কতটা ন্যায়সংগত?

মামলায় বিপুল পরিমাণ নথি ও প্রমাণ রয়েছে বলে আদালতে উল্লেখ করা হলেও সেগুলোর বড় অংশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পরীক্ষা হয়নি। এমনকি গ্রেপ্তারের কয়েক বছর পরও মামলায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন না হওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সমালোচকদের মতে, দ্রুত বিচারের সাংবিধানিক নীতির সঙ্গে এত দীর্ঘ বিচারপূর্ব আটক সাংঘর্ষিক। তাদের যুক্তি, কোনো ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত হন কি না, তা আদালতের বিচারের বিষয়; কিন্তু বিচার শুরুর আগেই বছরের পর বছর কারাবন্দি থাকা কার্যত শাস্তির মতো হয়ে যেতে পারে।

ইউএপিএর কঠোর জামিন বিধান নিয়েও জাতিসংঘের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও দেশীয় নাগরিক অধিকার সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তাদের অভিযোগ, সন্ত্রাসবিরোধী এই আইনটি রাজনৈতিক মতবিরোধ, সাংবাদিকতা ও প্রতিবাদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করা হয়েছে এবং দীর্ঘ বিচারপূর্ব আটক অনেক ক্ষেত্রে কার্যত শাস্তিতে পরিণত হয়েছে।

তবে খালিদের মামলায় আদালতের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অভিযোগও নেই। আদালত বিদ্যমান আইন ও তার কঠোর জামিন কাঠামোর মধ্যেই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে বলা হয়েছে, অস্বাভাবিক দীর্ঘ কারাবাস ও বিচারপ্রক্রিয়ায় বিলম্ব বিশেষ পরিস্থিতিতে জামিনের কারণ হতে পারে।

স্বাধীনতার প্রশ্নে উমর খালিদের মামলা

উমর খালিদের মামলা নাগরিকত্ব আইনবিরোধী আন্দোলন, ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গা এবং ভারতে রাজনৈতিক ভিন্নমতকে নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখার প্রবণতা—এই তিনটি বিষয়কে একই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে।

তার সমর্থকদের মতে, সরকারের নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তাকে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, তিনি গুরুতর ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন—যার বিচার আদালতেই নির্ধারিত হওয়ার কথা।

শেষ পর্যন্ত খালিদ দোষী না নির্দোষ, সেটি নির্ধারণ করার দায়িত্ব আদালতের। কিন্তু প্রায় ছয় বছর ধরে বিচার না হওয়াই এখন তার মামলার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের মূল্যায়ন শুধু রাষ্ট্রের অর্জন দিয়ে নয়, রাষ্ট্র তার বিরোধীদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করে—তার মাধ্যমেও হয়।

উমর খালিদের মামলা তাই শুধু একজন ব্যক্তির জামিনের প্রশ্ন নয়; এটি ভারতের বিচারব্যবস্থায় দ্রুত বিচার, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার কতটা কার্যকরভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে—সেই বৃহত্তর প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।

সূত্র: দ্য অবজার্ভার পোস্ট

এআরবি

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন