বাংলাদেশের কৃষি আজ বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। নদীর পানি কমে যাওয়া, জলাবদ্ধতা, খরা, লবণাক্ততা, কৃষিজমি হ্রাস, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থায় করপোরেট নিয়ন্ত্রণ—সব মিলিয়ে কৃষক সমাজ এক কঠিন বাস্তবতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘তিস্তা থেকে পদ্মা’ শুধু নদীকেন্দ্রিক উন্নয়ন ভাবনা নয়; এটি বাংলাদেশের কৃষি, পানি ও অর্থনীতিকে নতুনভাবে পুনর্বিবেচনার একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দর্শন।
রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে সমবায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতি ক্রমেই করপোরেট পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। কৃষি, বীজ, খাদ্য বাজার, শস্য সংগ্রহ, এমনকি পানি ব্যবস্থাপনায়ও করপোরেট স্বার্থের প্রভাব বাড়ছে। বহুজাতিক কোম্পানি ও বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে কৃষক ধীরে ধীরে স্বাধীন উৎপাদক থেকে নির্ভরশীল ভোক্তায় পরিণত হচ্ছে। কৃষক তার বীজ, সার, কীটনাশক ও বাজার—সব ক্ষেত্রেই করপোরেট ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ফলে কৃষির প্রকৃত লাভ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী ও করপোরেট গোষ্ঠীর হাতে, আর কৃষক আটকে যাচ্ছে ঋণ, অনিশ্চয়তা ও বাজার বৈষম্যের চক্রে।
এই বাস্তবতায় সমবায়ভিত্তিক কৃষি শুধু অর্থনৈতিক বিকল্প নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, কৃষকের আত্মমর্যাদা এবং স্থানীয় অর্থনীতির পুনর্গঠনের একটি পথ। পৃথিবীর বহু দেশ কৃষি উন্নয়ন ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে সমবায় ব্যবস্থাকে সফলভাবে ব্যবহার করেছে।
চীনের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির কৃষি সংস্কারের ইতিহাসে গ্রামীণ সমবায়, যৌথ সেচব্যবস্থা, স্থানীয় উৎপাদন সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পরে চীন বাজার অর্থনীতির কিছু উপাদান গ্রহণ করলেও কৃষি ও গ্রামীণ অবকাঠামোয় রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং সমবায় কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে দেয়নি। ফলে তারা কৃষিকে শিল্পায়নের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে।
ভিয়েতনামও যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থা থেকে উঠে এসে সমবায়ভিত্তিক কৃষি সংস্কারের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। আজ দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধান ও কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক রাষ্ট্র। কৃষক সংগঠন, সেচব্যবস্থা, গ্রামীণ অবকাঠামো ও রাষ্ট্রীয় সহায়তার সমন্বিত নীতির কারণেই তারা এই সফলতা অর্জন করেছে।
এছাড়া নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক এবং ভারতের কিছু অঞ্চলেও কৃষি সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভারতের ‘আমূল’ সমবায় মডেল দেখিয়েছে, কীভাবে ক্ষুদ্র খামারি ও দুগ্ধ উৎপাদকদের সংগঠিত করে শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা যায়।
বাংলাদেশেও এ ধরনের সমবায়ভিত্তিক কৃষি আন্দোলনের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। তিস্তা অববাহিকায় পানি সংরক্ষণ, পদ্মা অঞ্চলে ব্যারাজ ও সেচব্যবস্থা, ভবদহে জলাবদ্ধতা নিরসন, হাওর ও চলন বিলে পরিকল্পিত জলাভূমি ব্যবস্থাপনা—এসব উদ্যোগকে কৃষক সমবায়ের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
নয়া কৃষির ধারণা শুধু জমিতে ফসল উৎপাদনের প্রশ্ন নয়; এটি পানি, নদী, মৎস্য, পশুপালন, দুগ্ধশিল্প, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং স্থানীয় শিল্পের সমন্বিত অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রশ্ন। সমবায়ভিত্তিক প্যাডি সাইলো নির্মাণ, পোলট্রি, মাছ চাষ, গবাদি পশু পালন ও দুগ্ধখামার গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে। উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই সমবায় কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে স্থানীয় উন্নয়নের বিকেন্দ্রীভূত মডেল গড়ে তোলা সম্ভব।
আজকের করপোরেট পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা কৃষিকে ধীরে ধীরে বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যেতে চায়। কৃষক যেন নিজের জমির মালিক হয়েও উৎপাদনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে না ফেলে—সেই লড়াই এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ‘তিস্তা থেকে পদ্মা’ নতুন কৃষি আন্দোলনের প্রতীক হতে পারে; যেখানে নদী থাকবে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে, কৃষক হবে অর্থনীতির মূল শক্তি এবং সমবায় হবে উৎপাদন ও বণ্টনের প্রধান ভিত্তি।
বাংলাদেশের বিদ্যমান কৃষিনীতি পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। কারণ বর্তমান নীতিতে কৃষক, নদী ও গ্রামীণ অর্থনীতির চেয়ে করপোরেট বাজার ব্যবস্থাকেই বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের সংবিধান সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে। আজ সবাই সংবিধানের কথা বললেও রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে সমবায়, কৃষকের মালিকানা ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন প্রায় অনুপস্থিত। এর পরিবর্তে করপোরেট পুঁজির বিস্তারকে সহজ করতে কৃষি, খাদ্য ও বাজারব্যবস্থাকে ক্রমেই বহুজাতিক এবং বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় ‘তিস্তা থেকে পদ্মা’ শুধু নদী বা কৃষির প্রশ্ন নয়; এটি সংবিধানের মূল চেতনা—সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমবায়ভিত্তিক অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের আহ্বান। তাই প্রয়োজন কৃষককেন্দ্রিক নতুন কৃষিনীতি, যেখানে নদী ও পানিসম্পদ রক্ষা, সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন, স্থানীয় বাজার সুরক্ষা এবং কৃষকের অর্থনৈতিক অধিকারকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে কৃষি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে নতুনভাবে সাজানো ছাড়া বাংলাদেশের সামনে টেকসই উন্নয়নের আর কোনো বিকল্প নেই। সে কারণেই জলবায়ু অভিযোজনের অংশ হিসেবে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’কে অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়নের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শুধু উত্তরাঞ্চলের সেচ, নদী পুনরুদ্ধার ও কৃষি অর্থনীতিই শক্তিশালী হবে না; বরং এর অভিজ্ঞতা ধাপে ধাপে পদ্মা অববাহিকা, ভবদহ, হাওর, চলন বিলসহ দেশের অন্যান্য জলাভূমি ও নদীকেন্দ্রিক অঞ্চলেও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে।
অতএব ‘তিস্তা থেকে পদ্মা’ শুধু একটি উন্নয়ন প্রকল্পের নাম নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কৃষি-অর্থনীতির নতুন রূপরেখা। যেখানে জলবায়ু অভিযোজন, নদীভিত্তিক পরিকল্পনা, সমবায় অর্থনীতি এবং কৃষকের ন্যায্য অধিকার মিলেই গড়ে উঠবে একটি মানবিক, স্বনির্ভর ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ।
লেখক : সভাপতি, তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

