অপরাধী ধরা মন্ত্রীর কাজ হতে পারে না

অপরাধী ধরা মন্ত্রীর কাজ হতে পারে না
প্রতীকী ছবি

সরকারের একজন সম্মানিত মন্ত্রীর কাজ অপরাধী ধরা হতে পারে না—এমনকি যদি সেই কাজের পরিধি, প্রশাসনিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে, বেসরকারি খাত পর্যন্ত ও বিস্তৃত হয়। কাজের বিশালতার কারণে এটি কোনো কার্যকর প্রক্রিয়া না, অপরাধ প্রতিরোধ করা কোনো মন্ত্রণালয়ের একমাত্র লক্ষ্য না। সম্মানিত মন্ত্রীদের মনোযোগ দেওয়ার মতো আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। যারা নীতিনির্ধারকদের ভোট দিয়েছেন, সেই জনগণের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ঘটানোর দায়িত্ব নীতিনির্ধারকরা নিজেরাই গ্রহণ করেছেন। তাদের মূল কাজ হবে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, হালনাগাদ করা ও শক্তিশালী করা—যা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অনিয়ম বা বিধি লঙ্ঘনের বিষয়গুলো সামাল দিতে পারবে। এর একটি উপায় হতে পারে কর্মীদের স্বচ্ছতা, কাজের মান এবং ফল তদারকির জন্য একটি ত্রুটিমুক্ত কর্মপরিধি। একই সঙ্গে তদারককারীদের কঠোরভাবে সতর্ক করা যে, ব্যর্থতার দায়ে তাদের শুধু তিরস্কারই শুনতে হবে না, বরং চাকরিও হারাতে হতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় শীর্ষে থাকা কর্মকর্তা মন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি করবেন সরাসরি। এই জবাবদিহির আওতা সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতের জন্যই প্রযোজ্য হতে হবে। এই ব্যবস্থায় নিশ্চিত করতে হবে যে, নিম্নস্তরের তদারককারীরা যেন পর্যায়ক্রমে তাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি করেন। তবে জবাবদিহি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলেও তা একমাত্র কাজ নয়।

বিজ্ঞাপন

মানুষের চোখে যা প্রথমেই ধরা দেয়

স্বাস্থ্য খাত-প্রদত্ত সেবার মান ও আওতা বৃদ্ধির আশায় মন্ত্রী অপরাধী ধরার জন্য ব্যগ্র। নিঃসন্দেহে, এই দুটি লক্ষ্য পূরণ করাই এ খাতের প্রত্যাশিত কাজ। তবে যখন অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিই মুখ্য দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় তখন কিছু কিছু ভুল পদক্ষেপও দেখা দিতে পারে। কিছু কিছু ঘটনা দেখা গেছে যেখানে মন্ত্রণালয়কে শেষ পর্যন্ত তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করা হবে না—মন্ত্রণালয়ের এই কঠোর অবস্থান জানান দিতে গিয়ে অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতিকে তাড়াহুড়োর সঙ্গে সামলানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, সামগ্রিক বিষয়গুলো বিশ্লেষণ ব্যতিরেকে। আমরা মন্ত্রীর সদিচ্ছাকে সাধুবাদ জানাই, কিন্তু স্বাস্থ্য খাত অত্যন্ত জটিল, দুরূহ এবং ঝুঁকিপূর্ণ একটি ক্ষেত্র। এটি একটি বিশাল ও বৈচিত্র্যময় খাত, যেখানে রয়েছে অসংখ্য বিষয়, দক্ষতা, পদমর্যাদা, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি এবং নানা মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এই খাতের প্রকৃত প্রভাব অনেক সময় গভীরভাবে অদৃশ্য বা অস্পষ্ট থেকে যায়।

স্বাস্থ্য খাতে অগ্রাধিকারগুলো কী হওয়া উচিত

স্বাস্থ্য খাত থেকে মানুষ যে সেবা পায় এবং তা পাওয়ার যে জটিল ও দুরূহ প্রক্রিয়া—এর ফলে মানুষ পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়। আমাদের বুঝতে হবে যে, যাদের স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন তাদের সবাই তা পান না; আবার কেউ কেউ সেবা পেলেও তা পেতে দেরি হয়ে যায়। এর একটি কারণ হলো মানুষের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে নিজস্ব আচরণ; যেমন—হাতুড়ে চিকিৎসকদের পেছনে ছোটা এবং অকার্যকর চিকিৎসার পেছনে সময় ও অর্থ নষ্ট করা। এর ফলে যোগ্য ও দক্ষ চিকিৎসকদের পক্ষে সেবা প্রদান করা জটিল, ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে, যা অনেক সময় জীবন রক্ষায় ব্যর্থতার কারণ হয়। তবে এই বিলম্বের দায় সরকারের ওপরও বর্তায়। জনগণের অজ্ঞতা আসলে সরকারেরই অজ্ঞতার পরিচায়ক। পরিস্থিতি জটিল হয়ে চিকিৎসাকে কঠিন করে তোলার আগেই, যাদের প্রয়োজন তাদের সবার কাছে সময়মতো স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সরকারকে কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। এই কৌশলের দুটি দিক থাকা উচিত : প্রথমত, সেবা প্রয়োজন এমন রোগীদের তথ্য সময়মতো স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের কাছে পৌঁছানো এবং দ্বিতীয়ত, সেবাগ্রহীতারা যেন প্রাপ্ত সেবায় সন্তুষ্ট হন তা নিশ্চিত করা। এই দুটি বিষয় সেবার আওতা ও গুণমান সম্পর্কিত। সেবার আওতা বৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত গুণমান নিশ্চিত করার ওপর ও নির্ভরশীল হতে হবে; অন্যথায়, সেবা কেন্দ্র বা হাসপাতাল খোলা থাকা সত্ত্বেও মানুষ সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। গুণমান বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে সেবার আওতা বাড়ানোর প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হবে। সেবার আওতাকে অর্থবহ ও দৃশ্যমান করে তোলার লক্ষ্যে, ‘স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন’ প্রথমে উপজেলাভিত্তিক জরিপ পরিচালনার পরামর্শ দিয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল প্রতিটি উপজেলার জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যগত সমস্যাগুলো, যা একে অন্যের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে, তা নিরূপণ করা। জরিপের পরবর্তী ধাপে সরকারকে উপযুক্ত ধরনের/শ্রেণির পর্যাপ্তসংখ্যক, দক্ষতাসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে—অর্থাৎ কোন ধরনের সেবাপ্রদানকারী কী সংখ্যায় প্রয়োজন, কোথায় প্রয়োজন, তাদের নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতির প্রক্রিয়া এবং শর্ত নির্ধারণ।

স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের প্রয়োজনীয় উপকরণ (যেমন—ওষুধ, যন্ত্রপাতি, অন্যান্য সামগ্রী) এবং পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত কর্মপরিবেশ (ভৌত অবকাঠামো) দিয়ে সজ্জিত করতে হবে। এছাড়া, কোনোভাবেই যেন ব্যত্যয় না ঘটে, সেভাবে পর্যাপ্ত পরিচালন বাজেট নিশ্চিত করতে হবে। এই বাজেটের খাতগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে—পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, সেবার কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করার জন্য তত্ত্বাবধান, লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য মনিটরিং এবং বিভিন্ন সেবা, কর্মসূচি ও কার্যক্রমের ফলের পর্যালোচনা এবং মূল্যায়ন। স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা এবং সেবাগ্রহণকারী, সেবা প্রদানকারী ও সেবা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা বিধান এবং ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ, বিদেশে গিয়ে যাতে সেবা নিতে না হয় এবং দেশের ভেতরেই যাতে সেবার প্রাপ্তি নিশ্চিত করা যায়, সেজন্য দেশে সেন্টার অব এক্সেলেন্স হাসপাতাল তৈরি ও ব্যবস্থাপনা, মেডিকেল ট্যুরিজম সৃষ্টি ইত্যাদির দিকে নজর দিতে হবে। প্রয়োজনীয়সংখ্যক, আইসিইউ ও সিসিইউসহ হাসপাতালে সব ধরনের শয্যা ও সেবাপ্রদানকারী, চাকরির শর্তাবলির হালনাগাদকরণ এবং দায়-দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস, ক্রয় ও সংগ্রহের নীতিমালার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও এর আলোকে কার্যকর পদ্ধতি গ্রহণ, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ইত্যাদি সম্পর্কিত সিদ্ধান্তগুলো ও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সর্বোপরি এমন একটি কৌশল থাকা প্রয়োজন, যা অসুস্থতা প্রতিরোধ করতে এবং অসুস্থতাকে শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ ও সীমিত রাখতে এবং রোগীর পুনর্বাসনে সক্ষম হবে। এই কৌশলটির দুটি দিক আছে প্রথমত, অসুস্থতা কেন হয় এবং কীভাবে সুস্বাস্থ্য ও পুষ্টির সুফল পাওয়া যায়—সে বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা। দ্বিতীয়ত, অসুস্থতা দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা শনাক্ত করা এবং এর বিস্তার রোধ করা। এর জন্য প্রয়োজন মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গণযোগাযোগ কার্যক্রম জোরদার করা এবং সময়মতো নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুবিধার্থে অসুস্থতার ঘটনা সম্পর্কে নজরদারি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। এই দুটি কর্মসূচিতে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, কারণ এগুলোর মাধ্যমেই সর্বোত্তম সুফল পাওয়া সম্ভব।

উপযুক্ত পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত বাজেট প্রণয়নের শুরুতে মন্ত্রণালয়কে যথেষ্ট সময়, অভিজ্ঞতা, গভীরতা এবং প্রজ্ঞার প্রয়োগ ঘটাতে হবে। পরিকল্পনা ও বাজেটের দুর্বলতা পরে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে। এই বিপর্যয় রোধে পরে যতই বীরত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা চালানো হোক না কেন, তা আর কোনো কাজে আসবে না। দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত খাতভিত্তিক কার্যকর নীতি ও কৌশল প্রণয়ন, যেখানে আন্তঃখাত দৃষ্টিভঙ্গি—‘সকল খাতের নীতিতে স্বাস্থ্য’—বিবেচনায় রাখা হবে। এর জন্য নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোতে পরিবর্তন প্রয়োজন। এই পরিকল্পনা ও কৌশল প্রণয়নের দায়িত্ব তাদের ওপরই ন্যস্ত করা উচিত, যারা এই খাত এবং সংশ্লিষ্ট খাত সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখেন। আমাদের এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে যে, অত্যন্ত জটিল ও কারিগরি বিষয়সমৃদ্ধ এই খাতটি এমন ব্যক্তিদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না, যারা জ্ঞানভিত্তিক, অভিজ্ঞতালব্ধ ও প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত বা সমাধান প্রদানের ক্ষেত্রে অদক্ষ।

ক্লিনিক্যালসেবা এবং জনস্বাস্থ্যসেবা-ব্যবস্থাপনা পৃথক পৃথক কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্ত করার জন্য একটি বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। রোগীর চিকিৎসা এবং অসুস্থতা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ—এ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিপরীতমুখী ক্ষেত্র; তাই এ দুটির মধ্যে পৃথককরণ অপরিহার্য।

সেবার মান ও পরিমাণ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন সেবা প্রদানকারীদের বিভিন্ন ক্যাটাগরি অনুযায়ী পর্যাপ্তসংখ্যক চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং এসব প্রতিষ্ঠানের মানসম্মত কার্যক্রম। মানসম্মত কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সঠিক অনুপাত, উপযুক্ত ও পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক এবং পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ, কার্যকর প্রশিক্ষণ ও এর ম্যানুয়াল এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তি এবং গবেষণা। শিক্ষকদের মধ্যে উন্নততর শিক্ষাদান-পদ্ধতি ও আচরণের চর্চা থাকা প্রয়োজন, যাতে তারা শিক্ষার্থীদের—যারা ভবিষ্যতে ডাক্তার, নার্স, প্যারামেডিক ও সহায়ক কর্মী হিসেবে কাজ করবেন—তাদের মধ্যেও একই গুণাবলি সঞ্চারিত করতে পারেন। এ লক্ষ্যে, ‘স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন’ শিক্ষকদের—যাতে তারা ব্যক্তিগত প্র্যাকটিসের প্রতি নিরুৎসাহিত হন এবং দুর্গম এলাকায় কর্মরত সেবা প্রদানকারীদের —যাতে তারা সেসব এলাকায় অবস্থান করেন, তাদের জন্য উপযুক্ত পারিশ্রমিক, পুরস্কার, ক্ষতিপূরণ, ভাতা, বোনাস ইত্যাদি প্রদানের সুপারিশ করেছে; তবে এসব সুবিধা সত্ত্বেও দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা কর্মস্থল ত্যাগ করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে। এই কৌশল বাস্তবায়নের সুবিধার্থে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য খাত যেসব সমস্যার সম্মুখীন, যেমন—অনুপযুক্ত কাঠামো, কার্যক্রমের পুনরাবৃত্তি; অদক্ষতা এবং কার্যক্রম ও কর্মসূচির সমন্বয়ের অভাব—সেগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে মন্ত্রণালয়কে। এসব কার্যক্রম ও কর্মসূচি অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অথবা বিশৃঙ্খলভাবে, পুনরাবৃত্তিমূলকভাবে ও অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে একাধিক সংস্থা, দপ্তর ও খাতের মাধ্যমে একই ধরনের সেবা সংগঠনের কারণে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন পড়ছে।

সেবার মান ও আওতা বৃদ্ধি এবং সেবাগ্রহীতাদের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কিছু আইনের সংশোধন ও নতুন আইনের প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে—হাসপাতালের মানের স্বীকৃতি বা অ্যাক্রেডিটেশন; ওষুধের সঠিক মূল্য নির্ধারণ ও ওষুধ ও কসমেটিকস আইন ২০২৩, সিটি করপোরেশন/পৌরসভা আইন (২০১০), কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট আইন ২০১৮ রহিতকরণ, সর্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা আইন প্রবর্তন, স্বাস্থ্যসেবা—অর্থায়ন আইনপ্রবর্তন, স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত বিভিন্ন কাউন্সিলের আইনের সংশোধন ও নবায়ন, হাসপাতাল ও রোগ নির্ণয়কারী পরীক্ষাগারের ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা সম্পর্কিত আইন, বাংলাদেশ মেডিকেল এডুকেশন অ্যাক্রেডিটেশন অ্যাক্ট ২০২৩, বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিলভিত্তিক আইন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন (যা প্রকৃতপক্ষে হওয়া উচিত—স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা আইন)। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মেসি, রক্ত ​​সঞ্চালন কেন্দ্র এবং অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবার মতো খাতগুলোর পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য সুনির্দিষ্ট বিধিমালা প্রণয়ন; পাশাপাশি প্রয়োজনে এসব সেবায় বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিশ্চয়ই অনুধাবন করেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মাধ্যমেই অনিয়ম রোধ করা সম্ভব নয়। এমনকি যদি প্রতিটি নাগরিকের জন্য একজন করে পুলিশ সদস্যও নিয়োগ করা হয়, তবু না। আশা করি, সম্মানিত পাঠকরা জানেন কেন। মন্ত্রী যদি অপরাধী ধরার পেছনে সময় ব্যয় না করে পুরো ব্যবস্থাকে আরো দক্ষ ও কার্যকর করে তোলার ওপর জোর দেন, তবে তিনি সমস্যাগুলো আরো ভালোভাবে সমাধান করতে পারবেন; কারণ একটি শক্তিশালী ও দক্ষ ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুধু অপরাধই রোধ করবে না, বরং পুরো খাতের সামগ্রিক কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে, যা শেষ পর্যন্ত সবার জন্যই একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করবে।

মন্ত্রণালয় যেসব নীতি, কৌশল ও পরিকল্পনা অনুমোদন করবে, এর মধ্যে কিছু বিষয় হবে আইনভিত্তিক শাসন এবং তদারকিসংক্রান্ত; কিছুর জন্য প্রয়োজন হবে সংস্কার ও সেই সংস্কারকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে আইনি সহায়তা; আবার কিছু বিষয় হবে কর্মসূচিভিত্তিক সেবা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা, নথিপত্র এবং প্রতিবেদনভিত্তিক তথ্য, পরিকল্পনা ও কর্মদক্ষতা পর্যালোচনায় জনগণের অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত নকশা এবং ওষুধ ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা। এসব কাজের জন্য প্রয়োজন হবে কারিগরি বিশেষজ্ঞদের, যারা সংশ্লিষ্ট নীতি, পরিকল্পনা, কৌশল, কর্মপরিকল্পনা ও আইনি কাঠামো প্রণয়ন করবে; যা চূড়ান্ত পর্যায়ে মন্ত্রণালয় অনুমোদন করবে এবং যা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নকারী শাখাগুলো কার্যকর করবে। এই খসড়া প্রণয়নের জন্য অন্তত ছয় থেকে আট মাস এবং বাস্তবায়নের জন্য অন্তত দুই বছর সময়ের প্রয়োজন হবে—তবেই ব্যবস্থাটি নিজস্ব গতিতে চলতে শুরু করবে। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, কোনো সরকারই তাদের মেয়াদের শেষ দুই বছরে জটিল সংস্কার, নতুন কৌশল, পরিকল্পনা বা পদক্ষেপ বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখায় না; এমনকি যদি সেসব পদক্ষেপ সামান্য কিছু মানুষের কাছেও অপ্রীতিকর বা অস্বস্তিকর মনে হয়। কিন্তু একটি ঘরে সন্তোষজনকভাবে বসবাস করার জন্য প্রথমে ঘর সামগ্রিকভাবে এবং সুনিপুণভাবে সাজাতে হবে। এখানে-ওখানে পেরেক ঠুকে এটা করা যাবে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন