মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ আলোচনায় রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে নজর

মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ আলোচনায় রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে নজর
আমার দেশ গ্রাফিক্স

অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরো সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মুক্তবাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) প্রথম দফার আনুষ্ঠানিক নেগোসিয়েশন ঢাকায় শুরু হচ্ছে। এ লক্ষ্য মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের (এমআইটিআই) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ড. রশিদি সাইদের নেতৃত্বে ৩০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আজ সোমবার ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। আর প্রথম দফা আলোচনা শুরু হচ্ছে আগামীকাল মঙ্গলবার। আলোচনা চলবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তুত করা খসড়া এবং মালয়েশিয়ার প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর ওপর বিস্তারিত আলোচনা হবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এফটিএ অনুবিভাগ ইতোমধ্যে প্রস্তুতি নিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্যমাত্রা

বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, গত জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় দুই দেশের সরকারপ্রধান মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত পোষণ করেন। ওই সফরের যৌথ বিবৃতিতে ২০২৭ সালের মধ্যে একটি ব্যাপক, ভবিষ্যৎমুখী ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক এফটিএ সম্পন্ন করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছিল। সেই প্রতিশ্রুতির চার মাসের মধ্যেই প্রথম দফার এই আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সাম্প্রতিক এক সভার তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশ ইতোমধ্যে ‘টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর)’ চূড়ান্ত করেছে। চুক্তিটি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০টি অধ্যায়ের একটি খসড়া প্রস্তুতের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। উভয় দেশই আগামী এক বছরের মধ্যে এই চুক্তি সম্পন্ন করার ব্যাপারে আশাবাদী।

লক্ষ্য ২০২৭ : কৌশলগত বাণিজ্য চুক্তি

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ এফটিএ স্বাক্ষরের লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরকে নির্ধারণ করা হয়েছে। একই দিনে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ড. রশিদি সাইদ জানিয়েছিলেন, আসন্ন ঢাকা আলোচনায় দুই দেশের বাজারসুবিধা বৃদ্ধি, বিনিয়োগের প্রসার এবং নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টিসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় অগ্রাধিকার পাবে।

কেন প্রয়োজন এই এফটিএ?

বর্তমানে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চালু থাকলেও কোনো প্রাধিকারমূলক বা পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তি নেই। ফলে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা শুল্ক ছাড়, বিশেষ বাজার সুবিধা কিংবা বাণিজ্য সহজীকরণের প্রাতিষ্ঠানিক সুফল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

মালয়েশিয়ার সরকারি বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থা ‘মেট্রেড’-এর তথ্যমতে, একটি পূর্ণাঙ্গ এফটিএর মাধ্যমে অংশীদার দেশগুলো পরস্পরের বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে পারে। এর আওতায় শুল্ক কাঠামোর আধুনিকীকরণের পাশাপাশি বিনিয়োগ, সেবা খাত এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হয়।

জানা গেছে, বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তির সময়কালটি অত্যন্ত সংবেদনশীল, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণের প্রেক্ষাপটে। এলডিসি পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে বিদ্যমান শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত রপ্তানি সুবিধা সংকুচিত হয়ে আসবে। সেই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে দ্বিপক্ষীয় এফটিএ বড় ভূমিকা রাখবে।

বিশেষ করে, মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য যেমন—তৈরি পোশাক (নিট ও ওভেন), চামড়া ও পাদুকা, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষিপণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধিতে এফটিএ অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। অন্যদিকে, মালয়েশিয়া থেকে আমদানিকৃত প্রয়োজনীয় কাঁচামাল যেমন—জ্বালানি, যন্ত্রপাতি, লোহা ও ইস্পাত, প্লাস্টিক ও রাসায়নিক সামগ্রীর বাণিজ্য কাঠামোও এই চুক্তির মাধ্যমে সুসংগঠিত হবে।

বাণিজ্যে বিশাল ঘাটতি কমানোর চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্কে বর্তমানে বাংলাদেশের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি বিদ্যমান। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে এই বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট : ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ায় মাত্র ২৯৩.৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানি করে। বিপরীতে মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করা হয় ২.৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের পণ্য। ফলে এক অর্থবছরেই বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২.৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ১৮ মাসেও এই ব্যবধান প্রায় একই রকম রয়েছে। এ সময় বাংলাদেশ মালয়েশিয়ায় ৩০৫.৫৫ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করলেও আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২.২৬ বিলিয়ন ডলার।

বর্তমানে মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, ওভেন পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, খাদ্য ও পানীয়, প্রক্রিয়াজাত শাকসবজি এবং মসলা। এর বিপরীতে বাংলাদেশ মালয়েশিয়া থেকে প্রধানত খনিজ জ্বালানি, ভোজ্যতেল, লোহা ও ইস্পাত, প্লাস্টিক পণ্য, ভারী যন্ত্রপাতি ও শিল্প রাসায়নিক আমদানি করে থাকে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন