মোড়ে মোড়ে ‘অদৃশ্য পুলিশ’, এআই ক্যামেরায় ছয় শতাধিক মামলা

ওয়াসিম সিদ্দিকী

মোড়ে মোড়ে ‘অদৃশ্য পুলিশ’, এআই ক্যামেরায় ছয় শতাধিক মামলা

রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে ট্রাফিক পুলিশের বাঁশি কিংবা হাতের ইশারা উপেক্ষা করে যারা নির্বিঘ্নে সিগন্যাল ভাঙতেন, উল্টো পথে গাড়ি চালাতেন কিংবা যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করাতেন, তাদের জন্য নতুন দুঃসংবাদ হয়ে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি। ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে এখন মোতায়েন হয়েছে ‘অদৃশ্য প্রহরী’। আধুনিক এআই সক্ষম ক্যামেরার নজর এড়িয়ে ট্রাফিক আইন ভাঙা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ইতোমধ্যে রাজধানীর অন্তত ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক পয়েন্টে চালু হয়েছে এই প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, গত ৭ মে থেকে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ রাজধানীর অন্তত ৩০টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ‘অটোমেটেড ট্রাফিক প্রসিকিউশন’ এআইভিত্তিক ক্যামেরা ব্যবহার শুরু হয়েছে। বলা হচ্ছে, যেগুলো দীর্ঘদিন ধরেই যানজট ও অনিয়মের জন্য পরিচিত, সেগুলোকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। চালু হওয়া এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইতোমধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহারকে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

যেভাবে কাজ করছে ‘স্মার্ট’ নজরদারি

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর জাহাঙ্গীর গেট, বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর, শাহবাগ, কাকরাইল, মৎস্য ভবন, হাইকোর্ট মোড়, উত্তরা এয়ারপোর্ট এলাকা, গুলশানসহ ব্যস্ততম ট্রাফিক পয়েন্টগুলোতে এআই সক্ষম সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব এলাকায় নিয়ম ভাঙার প্রবণতা বেশি হওয়ায় প্রথম ধাপে এগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

নতুন এ ব্যবস্থায় মূলত পাঁচ ধরনের লঙ্ঘনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যেমন লাল বাতি অমান্য, স্টপ লাইনের বাইরে গিয়ে থামা, বিপরীতমুখী চলাচল, অবৈধ পার্কিং ও যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা। এসব অপরাধ সংঘটিত হলেই ক্যামেরা তাৎক্ষণিকভাবে ছবি ও ভিডিও ধারণ করবে। পরে সফটওয়্যার গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্ত করে বিআরটিএর তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা তৈরি করছে।

ছয় শতাধিক মামলা ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য

প্রযুক্তিটি চালুর পর থেকে গত ২৩ মে পর্যন্ত এআই সিস্টেম ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র সংগ্রহ করে ট্রাফিক যাচাই-বাছাই করে ৬১১টি মামলা দায়ের করেছে ট্রাফিক বিভাগ। ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ সিস্টেমটি পূর্ণ সক্ষমতায় চললে প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের বেশি মামলা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে সড়কে অপরাধীদের মধ্যে একধরনের ভীতি ও দায়বদ্ধতা তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

৫০০ পয়েন্টে বসবে এআই ক্যামেরা

ডিএমপির কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ধাপে ধাপে অন্তত ৫০০টি পয়েন্টে এআইভিত্তিক ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একইসঙ্গে বিআরটিএর তথ্যভান্ডার হালনাগাদ এবং সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নকেও এ প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এখন থেকে ট্রাফিক আইন ভাঙলেই ক্যামেরা তা ধরবে। গাড়ি থামিয়ে কাগজপত্র যাচাইয়ের পুরোনো পদ্ধতি ধীরে ধীরে কমে আসবে। এতে যানজট কমবে এবং চালকদের সঙ্গে পুলিশের তর্কবিতর্কও কমে যাবে।

নোটিস আসবে ঘরে, জরিমানাও ডিজিটাল

নতুন ব্যবস্থায় মামলার নোটিস পৌঁছানোর প্রক্রিয়াও ডিজিটাল করা হয়েছে। কোনো গাড়ি আইন ভাঙলে তার নম্বরপ্লেট থেকে মালিকের তথ্য সংগ্রহ করে মোবাইলে এসএমএস পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি নিবন্ধিত ঠিকানায় রেজিস্ট্রি ডাকেও নোটিস পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। নোটিস পাওয়ার ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে নির্ধারিত ব্যাংক কিংবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জরিমানা পরিশোধ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জরিমানা পরিশোধ না করলে মামলাটি আদালতে গড়াতে পারে। এমনকি গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হতে পারে বলে জানিয়েছে ডিএমপি।

পুলিশ জানিয়েছে, ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে প্রতারণার চেষ্টা হলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগ বা নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করতে হবে।

ডিএমপির মুখপাত্র উপ-পুলিশ কমিশনার এনএম নাসিরুদ্দিন আমার দেশকে বলেন, এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য কাউকে শাস্তি দেওয়া নয়, বরং রাজধানীর সড়কে একটি শৃঙ্খলিত পরিবেশ তৈরি করা। তিনি বলেন, ঢাকাকে আধুনিক নগরের মানদণ্ডে নিয়ে যেতে হলে প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। নতুন এ ব্যবস্থার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে গণমাধ্যমকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বানও জানান তিনি।

চ্যালেঞ্জ যখন নম্বরপ্লেট

তবে পুরো প্রক্রিয়াটি এখনো চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। যেসব যানবাহনের নম্বরপ্লেট অস্পষ্ট, বিকৃত বা অননুমোদিত, সেগুলো শনাক্ত করতে সমস্যায় পড়ছে সফটওয়্যার। এ কারণে ডিএমপি কমিশনার ইতোমধ্যে সতর্কতামূলক গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে এবং খুব শিগগির এ বিষয়ে আরো কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

সৌরশক্তিতে নতুন সিগন্যাল

প্রযুক্তির এই আধুনিকায়নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগও। গত ১১ মে রাজধানীর উত্তরা এয়ারপোর্ট গোলচত্বরে সৌরবিদ্যুৎচালিত অত্যাধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট উদ্বোধন করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ভারপ্রাপ্ত কমিশনার (সদ্য বিদায়ী) মো. সরওয়ার। বিদ্যুৎ না থাকলেও এই সিগন্যাল সচল থাকবে, যা রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বদলে যাচ্ছে ট্রাফিক সংস্কৃতি

ডিএমপির ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা বলেন, এ প্রযুক্তি চালুর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অভিজ্ঞতা। আগে কাগজের স্লিপে মামলা দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের ত্রুটি দেখা যেত। লেখা অস্পষ্ট, তথ্য ভুল কিংবা স্লিপ হারিয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। পরে পয়েন্ট অব সেল (পস) মেশিন চালু হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। কারণ গাড়ি থামিয়ে জরিমানা আদায়ের সময় সড়কে নতুন করে যানজট তৈরি হতো। বর্তমান ব্যবস্থায় সেসব সমস্যা অনেকটাই দূর হয়েছে। গাড়ি থামানো ছাড়াই আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ সংগ্রহ ও মামলা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় সড়কের স্বাভাবিক গতি বজায় রাখা সহজ হচ্ছে। একইসঙ্গে ট্রাফিক পুলিশের ওপর চাপও কমছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল প্রসিকিউশন ব্যবস্থা চালু হওয়ায় দুর্নীতির পথ বন্ধ হবে এবং চালকদের মধ্যে নিয়ম মানার প্রবণতা বাড়বে। রাজধানীর সড়কে এখন আর ট্রাফিক পুলিশকে চোখে না দেখলেই নিয়ম ভাঙার সুযোগ নেই। কারণ, মোড়ে মোড়ে অতন্দ্র প্রহরীর মতো নজর রাখছে এআই ক্যামেরা। ছয় শতাধিক মামলার এই পরিসংখ্যান শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং ঢাকার ট্রাফিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের স্পষ্ট বার্তা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...