রাজধানীর সন্নিকটে ঢাকার কেরাণীগঞ্জে ২৫ মেগাওয়াটপিক ক্ষমতার গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ১৪৭ কোটি ৯১ লাখ টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিউবো)। তবে প্রস্তাবিত নকশা ও জমির ব্যবহার পর্যালোচনা করে একই স্থানে ৩০ মেগাওয়াটপিক বা তার বেশি ক্ষমতার কেন্দ্র নির্মাণের সম্ভাবনা দেখছে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)। পাশাপাশি সেখানে একটি জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি গবেষণা, পরীক্ষা ও উদ্ভাবন কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্পটির নকশা, ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পূর্বাভাস ও গ্রিডে সংযোগের সক্ষমতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। এ অবস্থায় নীতিগত অনুমোদন ও অর্থায়নের সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
প্রকল্প নথি থেকে জানা যায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অর্থায়নের মূল উৎস হিসেবে ১২৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা ঋণ সংস্থানের পরিকল্পনা করা হয়েছে। বাকি অর্থের মধ্যে সরকারি তহবিল (জিওবি) থেকে ১১ কোটি ৭২ লাখ এবং বিউবোর নিজস্ব তহবিল থেকে ৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা জোগান দেওয়া হবে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে পিডিপিপি (প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) প্রণয়ন করা হয়েছে।
স্রেডার প্রতিনিধিদলের সরেজমিন পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগের কার্যকারিতা বাড়তে পারে। কেরাণীগঞ্জে বিউবোর মোট অধিগ্রহণ জমির পরিমাণ প্রায় ১৯৫.২ একর। এর মধ্যে বাংলাদেশ পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের (বিপিএমআই) প্রশিক্ষণ একাডেমির জন্য ২৫ একর এবং অন্য কাজে বরাদ্দ জমি বাদ দেওয়ার পর প্রায় ৬২.৭ একর অব্যবহৃত রয়েছে। কমিটি প্রাথমিকভাবে এর মধ্যে ৫৫ একর সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রটির উৎপাদনক্ষমতা, গ্রিড সংযোগের উপযোগিতা এবং সম্ভাব্য ব্যয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিরপেক্ষ ও অভিজ্ঞ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করা প্রয়োজন বলে মত দেন।
প্রকল্পের কারিগরি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রচলিত সাউথ-ফেসিং ব্যবস্থার পরিবর্তে ৫ থেকে ১০ ডিগ্রি টিল্টবিশিষ্ট ‘ইস্ট-ওয়েস্ট ফেসিং’ কনফিগারেশন গ্রহণ করলে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যাবে। সাউথ-ফেসিং পদ্ধতিতে প্রতি মেগাওয়াটের জন্য ২.৪ থেকে ২.৮ একর জায়গার প্রয়োজন হলেও ইস্ট-ওয়েস্ট পদ্ধতিতে তা কমে ১.৮ থেকে ২.২ একরে নেমে আসে। ফলে নির্দেশিত ৫৫ একর জমিতে ২৫ থেকে ৩০ মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপন করা সম্ভব হবে, যা দৈনিক সমান্তরাল বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্যকর অবদান রাখবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণমুখী বিন্যাসে বার্ষিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ৪ শতাংশ বেশি হতে পারে। তবে জমির সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় কেরানীগঞ্জের জন্য পূর্ব-পশ্চিমমুখী নকশা কারিগরিভাবে বেশি উপযোগী বলে প্রাথমিক মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে দিনের সকাল ও বিকালে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ উৎপাদন পাওয়া যেতে পারে, যা গ্রিডের লোড ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হবে। তবে প্যানেলের নিচে কৃষিকাজ বা অন্য কাজে জমি ব্যবহারের সুযোগ কমতে পারে এবং ধুলাবালি পরিষ্কারে বাড়তি নজর দিতে হবে।
স্রেডার মূল্যায়নে, প্রস্তাবিত ব্যয় প্রতি মেগাওয়াটপিকের ব্যয় প্রায় ৬ কোটি ৭ লাখ টাকা। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক ইউটিলিটি-স্কেল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রকৌশল, সরবরাহ ও নির্মাণ (ইপিসি) ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করে প্রাক্কলনের যৌক্তিকতা যাচাইয়ের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের ক্ষমতা ২৫ থেকে বাড়িয়ে ২৮ বা ৩০ মেগাওয়াটপিক করা সম্ভব হলে প্রতি মেগাওয়াটে বিনিয়োগ ব্যয় কমতে পারে। তবে গ্রিড সংযোগের জন্য অতিরিক্ত লাইন, উপকেন্দ্র সম্প্রসারণ কিংবা অন্য অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন হলে ব্যয় বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই বিভিন্ন ক্ষমতার বিকল্পের জন্য বিদ্যুতের সমতলীকৃত উৎপাদন ব্যয় (এলসিওই), বিনিয়োগের অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার (আইআরআর) এবং ব্যয়-সুবিধা অনুপাত (বিসিআর) বিশ্লেষণের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) চরগলগলীয়া ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্রের সঙ্গে সংযোগের পরিকল্পনা রয়েছে। স্রেডার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে ২০/২৬ এমভিএ ক্ষমতার একটি পাওয়ার ট্রান্সফরমার রয়েছে। মোট আটটি আউটগোয়িং ফিডারের মধ্যে সাতটি সচল এবং একটি চালুর প্রক্রিয়ায় রয়েছে। উপকেন্দ্রটির পিক লোড প্রায় ৭.৫ মেগাওয়াট এবং অফ-পিক লোড প্রায় ৬ মেগাওয়াট।
প্রস্তাবিত সৌরকেন্দ্রের ক্ষমতা উপকেন্দ্রটির বিদ্যমান লোডের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিরাপদে গ্রহণ ও বিতরণ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ জন্য লোড ফ্লো, শর্টসার্কিট, ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ, বিপরীতমুখী বিদ্যুৎ প্রবাহ, সুরক্ষা সমন্বয়, গ্রিডের ধারণক্ষমতা এবং সম্ভাব্য উৎপাদন সীমিত করার প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে পূর্ণাঙ্গ গ্রিড ইমপ্যাক্ট স্টাডি করার সুপারিশ করেছে স্রেডা।
সব মিলিয়ে, কেরাণীগঞ্জের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটির পিডিপিপি প্রয়োজনীয় সংশোধন করে এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে স্রেডা। তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত ক্ষমতা, নকশা, গ্রিড সংযোগ, উৎপাদন পূর্বাভাস এবং ব্যয়ের যৌক্তিকতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করাই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


