রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা ক্রমশ বেড়ে চলছে। দিনের ব্যস্ত সময় থেকে শুরু করে গভীর রাতে বিভিন্ন সড়ক ও অলিগলিতে পথচারীদের টার্গেট করে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে টাকা, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী। কোথাও মোটরসাইকেলে এসে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে, আবার কোথাও পথচারীর গতিরোধ করে করা হচ্ছে ছিনতাই। কখনো কখনো ঘটছে প্রাণহানির ঘটনাও। এতে নগরবাসীর মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা।
এদিকে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান ও গ্রেপ্তারের কথা বলা হলেও, একের পর এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠছে। তারা বলছেন, ছিনতাইকারীরা কি দিনদিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি ঢাকাতে বেশ কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গত ২৯ আগস্ট ভোরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা সংলগ্ন সড়কে ছিনতাইকারীদের হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে নিহত হন বগুড়ার একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা রনজিনা পারভীন।
গত ২৬ জুলাই মোহাম্মদপুর রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের সামনে ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারান ফজলে রাব্বি সুমন নামে ২৫ বছর বয়সি এক যুবক। ৯ সেপ্টেম্বর বিকালে পল্লবী এ ব্লক এলাকার প্যারিস রোডসংলগ্ন কাঁঠালতলা মাঠে সজীব (২৪) নামে এক কিশোর ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে মারা যায়। ২৯ আগস্ট রাজধানীর কদমতলীতে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে জনি (৩৫) নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন। ১১ জুন রাজধানীর শেরে বাংলানগর থানা এলাকায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে দুজন পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন।
এসব ঘটনায় জড়িতরা কেউ কেউ গ্রেপ্তার হলেও বেশির ভাগই থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় তাদের করা তালিকায় প্রায় ১,৩৪৩ জন চিহ্নিত ছিনতাইকারীর নাম রয়েছে। এরা প্রায় সময় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়। আবার জামিনে ছাড়া পেয়ে বের হয়ে আসেন।
তিনি বলেন, এদের কেউ ঢাকায় আবার ভাসমান ছিনতাইকারী। তারা রাতে ছিনতাই করে ঢাকায়। আবার দিনের বেলায় থাকেন ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতে। এতে পুলিশের অভিযান চালাতে হিমশিম পেতে হয়।
পাশাপাশি উত্তরার আবদুল্লাহপুর ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় টানা পার্টির উৎপাত এখন প্রকাশ্য। এতে ঢাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
জানা গেছে, আগে ভয় দেখিয়ে দুর্বৃত্তরা ভুক্তভোগীর কাছে সব ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যেত। আর এখন ছিনতাইকারীরা আগেই আঘাত করে জিনিসপত্র হাতিয়ে নিচ্ছে। এতে প্রাণ যাচ্ছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, দোকানিসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের।
এ অবস্থায় বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের টহল কমেছে বলে একাধিক এলাকার বাসিন্দাদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর পুলিশ বলছে, তারা ছিনতাই রোধে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন। পুলিশের টহলকে আরো বেশি বাড়ানো হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম আমার দেশকে জানান, ছিনতাই রোধে টহল এবং অভিযানের সংখ্যা বাড়িয়েছে। ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালানো হচ্ছে।
অপরাধ বিজ্ঞানীরা জানান, ছিনতাইকারীরা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধী নয়, তারা একটি সংঘবদ্ধ ও প্রশিক্ষিত চক্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে তারা বিভিন্ন মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে মানুষের সর্বস্ব লুট করছে, যা জনজীবনকে চরম বিপর্যস্ত করে তুলছে। তাই ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও আরো নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক জানান, ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ও সময়গুলো চিহ্নিত করে সেখানে দৃশ্যমান পুলিশি টহল ও উপস্থিতি বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে ভুক্তভোগীরা যাতে থানায় গিয়ে সহজে মামলা করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি আরো জানান, চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ এখন সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন গ্যাংয়ের আড়ালে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো কোনো সদস্যের স্বার্থসংশ্লিষ্টতা বা যোগসাজশ থাকতে পারে। এমন অপরাধ দমনে এই অভ্যন্তরীণ চক্রটি খতিয়ে দেখা এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুকি জানান, ছিনতাই প্রতিরোধে সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিচারকরাও এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। আমরা রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আসামিদের জামিনের কঠোর বিরোধিতা করছি।
ছিনতাইয়ের হটস্পট
ঢাকার যেসব এলাকা ছিনতাইয়ের হটস্পট বলে পরিচিত সেগুলো হলো—যাত্রাবাড়ীর ধলপুর, কমলাপুর বটতলা, খিলগাঁও, মালিবাগ রেলগেইট, দৈনিক বাংলা মোড়, পীরজঙ্গি মাজার ক্রসিং, মতিঝিল কালভার্ট রোড, নাসিরের টেক হাতিরঝিল, শাহবাগ, গুলবাগ, রাজউক ক্রসিং, ইউবিএল ক্রসিং পল্টন মোড়, গোলাপ শাহর মাজার ক্রসিং, হাইকোর্ট ক্রসিং, আব্দুল গণি রোড।
এছাড়া মানিকনগর স্টেডিয়ামের সামনে, নন্দীপাড়া ব্রিজ, বাসাবো ক্রসিং, মোহাম্মদপুরের বসিলা, বনানী রেলগেট, চেয়ারম্যানবাড়ী, উত্তরার আবদুল্লাহপুর ও কল্যাণপুর মূল সড়কেও ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি হচ্ছে।
ডিএমপি পরিসংখ্যান
রাজধানীতে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবরের শুরু পর্যন্ত ২৮১টি ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মোট মামলা হয়েছে ১৭২টি। এর মধ্যে তেজগাঁও বিভাগে মামলা হয়েছে ৩৪টি, রমনা বিভাগে ১৭, লালবাগে ৫, ওয়ারীতে ৩৮, মতিঝিল ২৫, মিরপুর ১৬, গুলশান ২০ ও উত্তরাতে ১৭টি মামলা হয়েছে। এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে ৩৯৯ জন।
এছাড়া পুলিশের আটটি জোনে ১,৪৫৩ জন ছিনতাইকারী রয়েছে। এর মধ্যে তেজগাঁও বিভাগে ২২১, মিরপুরে ১২৮, উত্তরা বিভাগে ১৫৫, ওয়ারিতে ২৩১, মতিঝিলে ২০৮, লালবাগে ১২৯, রমনায় ১৭৮ ও গুলশান বিভাগে ৯৩ জন ছিনতাইকারী আছে।
পুলিশের ডেটাবেজে মোট ১,৩৪৩ জন ছিনতাইকারীর নাম রয়েছে। এদের মধ্যে অনেকের ছবি ও নাম বিভিন্ন থানার সাইনবোর্ডে লাগানো রয়েছে।
মাদকের প্রভাব
জানা যায়, ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িতরা অধিকাংশই মাদকসাক্ত। তারা নেশার টাকা জোগাড় করার জন্য নানান ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া ছিনতাইকারীরা বিভিন্ন অস্ত্রও ব্যবহার করছে। ভুক্তভোগীরা সামান্য প্রতিরোধ করলে তাদের খুন করতেও দ্বিধা করেন না তারা।
কমেছে পুলিশি টহল
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়ে। সে সময় দেশের কয়েকটি কারাগার থেকে দাগি অপরাধীদের একটি বড় অংশ পালিয়ে যায়। আবার অনেকেই জামিনে বের হয়ে আসেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে যেসব পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন, তাদের অনেকের কাছেই সংশ্লিষ্ট থানা এলাকার ছিনতাইকারীসহ দাগি অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর অনেকেই বদলি হয়েছেন।
সূত্র জানায়, যারা ঢাকায় নতুন এসেছে তাদের অনেকের কাছে অপরাধের ডেটা ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা এবং ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। এতে ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ বাড়ছে। এছাড়া কিছু এলাকায় পুলিশের রাতের টহল একেবারের কমে গেছে বলে জানা গেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

