রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মিরপুরে টানা কয়েক মাস ধরে পানি না পাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাসিন্দারা। এতে করে রান্না, গোসল, খাওয়ার পানি সংগ্রহ এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজকর্ম অনেকটা স্থবির হয়ে পড়েছে হাজারো পরিবারের। এ সংকট মোকাবিলায় অনেকেই বাধ্য হয়ে বিকল্প উৎস থেকে অতিরিক্ত খরচে পানি সংগ্রহ করছেন। বাসিন্দাদের অভিযোগ, বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে বিষয়টি জানিয়েও স্থায়ী কোনো সমাধান মিলছে না।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে জনদুর্ভোগ আরো বাড়ার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এদিকে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছে, অতিরিক্ত চাহিদা, সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি এবং বিভিন্ন স্থানে মেরামতকাজ, কয়েকটি নলকূপ সম্প্রতি ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে সাময়িকভাবে এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তবে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়।
এদিকে শেওড়াপাড়া ইকবাল রোডে গত এক মাস ধরে পানি না থাকায় গতকাল রোববার দুপুর থেকে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী সড়ক অবরোধ করে রাখেন। এ সময় তারা হাঁড়ি-কলসি নিয়ে রাজপথে বিক্ষোভ করেন। তাদের দাবি—রাস্তা অবরোধ করে রাখলেই ওয়াসার যদি টনক নড়ে। বাড়িওয়ালা থেকে ভাড়াটিয়া পর্যন্ত একযোগে সবারই আধা গোসল, একবেলা রান্নার মধ্য দিয়েই কাজ শেষ করে পানির অপেক্ষা করতে করতে দিন গড়িয়ে মাস যাচ্ছে। উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তারা পানির দাবিতে রাজপথে নেমেছেন।
ঢাকা ওয়াসার পানির তীব্র সংকটের প্রতিবাদে রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী অতীতেও একাধিকবার বেগম রোকেয়া সরণিসহ প্রধান সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছেন। পানিসংকট, অবৈধ বাণিজ্য চক্র এবং খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তির কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা বাধ্য হয়ে কলস ও বালতি নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন।
বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী জানান, পশ্চিম শেওড়াপাড়া পীরেরবাগ রোডের বিউটি পার্লার গলিতে একমাস ধরে পানি নেই। কেউ সমাধান করে না। এ এলাকায় তিনটি পানির পাম্প রয়েছে, তারপরও পানি নেই। তারা অভিযোগ করেন, ওয়াসা সিন্ডিকেটে আবদ্ধ। তারা সিন্ডিকেট করে পানি বন্ধ রেখে, গাড়িতে পানি বিক্রি করে। আজ এক মাস থেকে পানি নেই। তাদের অভিযোগ এ এলাকার জনপ্রতিনিধি বাসিন্দাদের খোঁজ রাখে না। তিনি সোচ্চার হলে হয়তো এ সিন্ডিকেট ভেঙে যেত।
মিরপুরে টানা কয়েক মাস ধরে পানির সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে এলাকার বাসিন্দারা। শেওড়াপাড়া, পশ্চিম শেওড়াপাড়া ৬০ফিট, কাঁঠালতলা, নামাপাড়া, ইব্রাহিমপুরসহ একাধিক এলাকায় কোথাও পানি নেই। কোথাও অপ্রতুল সরবরাহে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে। দক্ষিণ পাইকপাড়ায় দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে তীব্র পানির সংকট। রাতে কয়েক ঘণ্টার জন্য পানি এলেও তা ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত।
এ সংকট শুধু মিরপুরে নয়, নর্দ্দা, কালাচাঁদপুর, কুড়িল, মহাখালী, বাইশটেকি, বনশ্রীসহ আরো কিছু এলাকায়ও দেখা দিয়েছে। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণের স্বামীবাগ, টিকাটুলী, লালবাগ, যাত্রাবাড়ী, মীরহাজারীবাগ, জুরাইনের বাসিন্দাদের ওয়াসার পানি সংকট দীর্ঘদিনের ।
পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা আবুল কাশেম কবিরাজ আমার দেশকে বলেন, ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকি অথচ ওয়াসার পানি নেই। গত সাতদিনে ওয়াসার পানির দেখা মেলে না। কোনোভাবে আধাবেলা খেয়ে গোসল না করে কাপড়-চোপড় ধোয়া ছাড়া জীবন চলছে। এভাবে কি চলতে পারে মানুষ?
ঢাকা ওয়াসার মুখপাত্র আব্দুল কাদের গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার প্রতিদিন পানি উৎপাদনের ক্ষমতা কমবেশি ৩০০ কোটি লিটার, চাহিদাও এমনই। তবে শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় পানির চাহিদা কিছুটা বেড়েছে। এছাড়া সাভারের ভাকুর্তা অয়েলফিল্ড প্রকল্পের কয়েকটি নলকূপ সম্প্রতি ঝড়ের কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই অয়েলফিল্ডের পানি দিয়ে মিরপুর এলাকায় পানি সরবরাহ করা হতো। এখন অন্য এলাকার গাড়িগুলো মিরপুর এলাকায় স্থানান্তর করে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া কিছু স্থানে সরবরাহ লাইনে ত্রুটি থাকায় পানি সরবরাহ কার্যক্রম কিছুটা বিঘ্নিত হচ্ছে। ঢাকা ওয়াসার শীর্ষ পর্যায় এ নিয়ে বৈঠক করেছে। সেখানে নলকূপগুলো দ্রুত মেরামতের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ওয়াসার আরেকটি সূত্র থেকে জানা গেছে, সাভারের ভাকুর্তা অয়েলফিল্ড থেকে প্রতিদিন ২৫ কোটি লিটার পানি উৎপাদনের কথা থাকলেও বর্তমানে সেখান থেকে ১০-১২ কোটি লিটার পানি উৎপাদন হচ্ছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং নলকূপগুলোর পানির উৎপাদন ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ওয়াসার হিসাব অনুযায়ী পানি উত্তোলন হচ্ছে না। এজন্য অন্য এলাকায়ও পানির সংকট তৈরি হচ্ছে।
শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা আনিকা সুলতানা বলেন, টোলারবাগ এলাকায় কয়েকদিন ধরে পানির সংকট বেশ প্রকট। প্রতি বছর এ সময় এলেই পানির সংকট তীব্র হয়। ওয়াসার কল সেন্টারে বারবার কল দিলেও পানির রিকুইজিশন নেওয়া হয় না।
নর্দ্দা এলাকার বাসিন্দা মেহেরুন্নেসা জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে পানি নেই। যেটুকু পানি আসে বাড়িওয়ালা সেটুকু মুখ চিনে চিনে ভাড়াটিয়াদের মধ্যে বণ্টন করেন।
জানা গেছে, ঢাকা ওয়াসার এক হাজার ৩৩১টি গভীর কলকূপের মধ্যে প্রায় ২০০টি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উৎপাদন বন্ধ। এছাড়া মাঝেমধ্যে লোডশেডিংয়ের কারণে বাকি নলকূপের পানি উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অবশ্য অন্য ছয়টি পানি শোধনাগারের মধ্যে পদ্মা-জশলদিয়া পানি শোধনাগার ছাড়া বাকিগুলোতে উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। তবে জশলদিয়া প্রকল্পের সরবরাহ লাইনের কাজ পুরোপুরি তৈরি হওয়ায় প্রতিদিন লক্ষ্যমাত্রার ৪৫ কোটি লিটার পানি উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও সেখান থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ কোটি লিটার।
ঢাকা ওয়াসা বলছে, পানির তেমন বড় সংকট নেই। কয়েক দিনের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের কমিটি নেই ২১ মাস