কর্মক্ষেত্রে প্রতি পাঁচজনে একজন মানসিক সমস্যায় ভোগেন। আর তাঁদের মধ্যে গুরুতর মানসিক অসুস্থতার জন্য ৮০ শতাংশ কাজ হারান। এসব মানুষ অনুপস্থিতি, কর্মদক্ষতা হ্রাস, কাজে কম মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব এবং মনে রাখার সমস্যায় ভোগেন। ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথের গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার রাজধানীর খাস ফুডের প্রধান কার্যালয়ে আঁচল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ‘টেকসই কর্মদক্ষতার জন্য সেল্ফ কেয়ার’ শীর্ষক মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় এ গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয় ।
ডব্লিউএফএমএইচের প্রতিবেদনে বলা হয়, মানসিক রোগের উল্লেখযোগ্য কারণ কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ। বিশ্বায়ন ও পুঁজিবাদের জন্য কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। আর এতে সৃষ্ট কাজের চাপে কর্মীরা বিষণ্ণতাসহ নানা মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অতিরিক্ত পরিশ্রম, কম পারিশ্রমিক, কর্মী ছাঁটাই, কর্মক্ষেত্রে অসন্তুষ্টি, সহকর্মীদের অসহযোগিতা, দারিদ্র্য ও সামাজিক অবস্থান হারানোর ভয়ে মূলত কর্মীরা বিষণ্ণতায় ভোগেন।
প্রতিবেদন অনুসারে, কর্মক্ষেত্রে ১০ শতাংশ কর্মী কেবল বিষণ্ণতার কারণে যথাযথভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন। তাঁদের মধ্যে ৯৪ শতাংশই কাজে মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মনে রাখার সমস্যায় ভোগেন। এতে একজনের গড়ে বছরে ৩৬ কর্মদিবস নষ্ট হয়।
কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ, অতিরিক্ত কাজের চাপ ও কর্মক্ষয় শুধু কর্মীদের ব্যক্তিগত সুস্থতাকেই প্রভাবিত করে না, এর প্রভাব পড়ে কর্মদক্ষতা ও কর্মপরিবেশেও। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মানসিক ও আবেগীয় সুস্থতা নিশ্চিত করতে তাই কর্মক্ষেত্রেই আত্মযত্নের চর্চা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এ লক্ষ্যেই খাস ফুডের কর্মীদের নিয়ে সেল্ফ কেয়ার ও মানসিক সুস্থতা বিষয়ক প্রশিক্ষণ আয়োজন করা হয়েছে।
কর্মশালায় কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপের বিভিন্ন কারণ, অতিরিক্ত কাজের চাপ, কর্মক্ষয়, আবেগীয় সুস্থতা এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থেকে কার্যকরভাবে কাজ করার জন্য আত্মযত্নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। কর্মব্যস্ততার মধ্যেও কর্মীরা কীভাবে নিজেদের মানসিক ও আবেগীয় সুস্থতার যত্ন নিতে পারেন, সে বিষয়ে দেওয়া হয় ব্যবহারিক ধারণা।
প্রশিক্ষণটি পরিচালনা করেন কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে তাঁর দীর্ঘদিন কাজ আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রধান মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সায়েদুর রহমান সাইদ এমবিবিএস, এমডি।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ ও কর্মক্ষয়ের কারণ শনাক্ত করার পাশাপাশি আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সময় ও শক্তির সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির বিষয়ে ব্যবহারিক ধারণা দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত সীমারেখা নির্ধারণ, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং কাজের চাপ থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় অভ্যাস নিয়েও আলোচনা করা হয়।
কর্মশালার অংশগ্রহণকারীদের জন্য মেডিটেশন ও মাইন্ডফুলনেসের চর্চা। কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ততার মধ্যেও অল্প সময়ে এসব অনুশীলন কীভাবে করা যায় এবং মানসিক চাপ মোকাবিলায় এগুলো কীভাবে সহায়ক হতে পারে, তা হাতে কলমে দেখানো হয়। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে প্রতিদিনের বিভিন্ন চাপের পরিস্থিতি নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা হয়। কর্মীরা নিজেদের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা ও সুস্থতা নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন এবং এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্ভাব্য বাস্তবসম্মত কৌশল সম্পর্কে ধারণা নেন। ফলে কর্মশালাটি শুধু বক্তৃতানির্ভর না হয়ে অংশগ্রহণমূলক আলোচনার ক্ষেত্রেও পরিণত হয়।
কর্মশালায় কর্মীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মযত্নবিষয়ক সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন, কর্মীদের সুস্থতা মূল্যায়ন, প্রয়োজন অনুযায়ী গোপনীয় মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শের সুযোগ, ভারসাম্যপূর্ণ কর্মপরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। কর্মক্ষেত্রে এমন পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়, যেখানে কর্মীরা মানসিক চাপ বা ব্যক্তিগত সমস্যার কথা নিরাপদে বলতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পেতে পারেন। কর্মীদের মানসিক সুস্থতা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; বরং একটি সুস্থ, উৎপাদনশীল ও টেকসই কর্মপরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কর্মীদের সুস্থতা নিশ্চিত করা শুধু ব্যক্তির দায়িত্ব হিসেবে দেখলে হবে না, এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কর্মসংস্কৃতি ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকেও যুক্ত করতে হবে। কর্মীদের মানসিক সুস্থতা ও কর্মদক্ষতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির জন্য নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা এবং সুস্থ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


